১
মাঠটি আগে কবরস্থান ছিল। যদিও এ তথ্য বাবারও শোনা কথা বলে মনে হয়। আগে এমনভাবে নিয়মিত মেলার জন্য ভাড়া দেওয়া হত না।
আঠাশ বছর বয়স অবধি আমার জীবন কেবলমাত্র স্মৃতির দাসত্ব নিয়ে কেটেছে। মনে হয়, জীবনে যা কিছু অভিজ্ঞতা তা একটি মানুষের গোটা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।মৃত্যু ছোট থেকেই আমার কানে ফিসফিস করে বলে যেত ভিতু, অথচ এই আমিই সাতাশ বছর বয়সেই চাইতাম মৃত্যুর সঙ্গে একটি নৌকোয় উঠে নদীর ওপারে চলে যেতে। নইলে বয়স ক্রমাগত বাড়া এবং মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করার মতো কঠিন কিছুই নয় আমার জীবনে। যদিও এটি স্রেফ মনে হওয়া।
মেলার ভীড়ের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। চারিদিকে রঙিন আলো এবং শব্দ বিরাট একটি দানব হয়ে যেন আমাকে গিলে ফেলেছে। নির্জনতা একসময় ভালো লাগত। এখন বেশ ভালো লাগে ভীড়ের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে। কিছুটা পথ এগিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম চুড়ির দোকানের সামনে। পকেট হাতড়ে খুঁজলাম। ঠিক কী তা জানি না।মাঝে মাঝে এভাবে পকেটে হাত রেখে কিছু একটা খুঁজে পেতে খুব ভালো লাগে। অনেকটা জাদুকরের টুপি থেকে খরগোশ বের করে নিয়ে আসার মতো আশ্চর্য।
ভাব্যর নরম হাত এসে আমার কব্জি ধরাতে খানিক কেঁপে উঠলাম। আশ্চর্য, ভাব্যর কথা কি আমি এতক্ষণে ভুলে গেছিলাম? অথচ ভাব্যর মুখে কোনও অভিযোগ নেই, অভিমান নেই, কাঠিন্য নেই। হয়ত ভাব্য এই প্রশ্নটি করতে পারত যে, “আমি কোথায় হারিয়ে গেছি?” হয়ত এমন প্রশ্ন করলে আমার ভালো লাগত। অথচ ভাব্য তার চোখ নাচিয়ে হাতের আঙুলটি যখন আমার দিকে বাড়িয়ে দিল, তখন ওর তৃতীয় আঙুলের অদ্ভুত আংটিটি আমার চোখ এড়িয়ে গেল। বরং মুহূর্তের ইশারায় ওর হাতের চারটি আঙুলের ওপর একবার ঠোঁট বুলিয়ে দিলাম। ঠোঁটে এসে লাগল আংটিটির কঠিন।
একটি নীল কাঁচের আংটির ওপর সবুজ রঙের ড্রাগন আঁকা। এমন মেলায় এই ধরণের আংটি সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না। অথচ ভালো করে আংটিটি আমি দেখতে পারছিলাম না, কারণ তখন আমরা নাগরদোলায়। যেন এক পলকের তফাতে। উচ্চতায় প্রবল ভয় আমার। আমি যথাসম্ভব ভাব্যর কোমর জড়িয়ে আছি। যখনই উঁচু থেকে নীচের দিকে নামছি, ভাব্য খুব জোরে আমার ঠোঁটে মিশিয়ে দিচ্ছে ওর ঠোঁট। আর যখন ধীরে ধীরে উপর দিকে উঠছে নাগরদোলা তখন আমাকে যে গল্পটি বলছে, তা আজ রাতে আমাদের প্রথম গল্প।
“মায়ের দুটো ঝুলন্ত পা প্রথম দেখেছিলাম আমি। বাড়িতে কেউ ছিল না। বহুক্ষণ ধরে দেখেছিলাম। তারপর দরজা খুব আসতে বন্ধ করে এসেছিলাম যাতে একটুও শব্দ না হয়।মনে হয়েছিল, একটুও শব্দ হলে মায়ের অসুবিধে হবে। তারপর পাশের বাড়ি, তার পাশের বাড়ি…(চুম্বন) তার পাশের বাড়ি। ধীরে ধীরে ভর্তি হয়ে উঠল আমার ঘর। আমার বাবা এসেছিল পার্টির কাজ সেরে একেবারে শেষে। মনের মধ্যে একটা সুপ্ত ভয় কাজ করছিল বাবার, যদি সত্যি কথাটা কোনওরকমভাবে বেরিয়ে পড়ে। গোপন কথাটি কোনওদিন প্রকাশ করিনি আমি। বাবা ও বাবার বন্ধুদের যৌনদাসত্ব করতে করতে মা মুক্তির পথ খুঁজে নিয়েছে। এটাই হয়ত বাবার রাজনৈতিক আদর্শ। তবে তা এক বোতল জোরালো দেশি মদ ছাড়া কিচ্ছু নয়। মায়ের ঘটনাটির কয়েকদিন পর থেকে যেমন চলছিল তেমন শুরু হল। যেন কোথাও কিছুই বদলে যায়নি। আমি ঘরে ছিটকিনি বন্ধ করে…(চুম্বন) খাটের তলায় ঠকঠক করে কাঁপতাম। মায়ের আত্মহত্যার ঘরটি ছেড়ে কোথাও যাওয়ার মতো শক্তি আমার ছিল না। দিনের বেলা যদিও পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হত।পেটভরে খেয়ে নিতাম আমি, কারণ জানতাম রাতের বেলা খাওয়া জুটবে না। আমার শোওয়ার ঘরের জানলা দিয়ে হলুদ রঙের আলোয় ভরা যে রাস্তাটির দিকে তাকিয়ে নিশ্বাস নিতাম। তারপর এল সেদিন, যেদিন থেকে ও আমার জানলার দিকে সারারাত তাকিয়ে থাকত এবং ভোরবেলা… (চুম্বন) হওয়ার আগেই চলে যেত। ঠিক আমার চোখের সোজাসুজি যেন আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করতে চায় ও। তারপর যেদিন থেকে বাবা নিরুদ্দেশ হল এবং আমাদের বাগান থেকে বড় রাস্তা ধরে রক্তের একটা দাগ পাশের ঝোপের মধ্যে পাওয়া গেল। সেদিনের পর থেকে ওকে আমি আর দেখিনি।”
“ও? ও বলতে?”
এবার চুম্বনটি আমার উদ্যোগে। ভাব্যর মনিদুটো জ্বলে উঠল আমার দিকে তাকিয়ে।লম্বাটে গভীর কালো চোখে ঠোঁটদুটি চেপে রেখে বলল – “একটি কালো চিতাবাঘ।”
২
বৃদ্ধা ভাগ্যগননাকারীর তাবুতে ঢোকার আগে অবধি ভাব্যর চুলের প্রজাপতিটি আমি দেখতে পাইনি। কাঁচের গোলকের মধ্যে বৃদ্ধা তার কুঁচকে যাওয়া মুখের চামড়ায় সামান্য তরঙ্গ তুলে আমাদের ভবিষ্যতের কথা দেখতে চাইলেন,অথচ তিনিও জানেন আমাদের ভবিষ্যৎ জানায় কোনও আগ্রহ নেই। আমরা কেবলই এই অভিজ্ঞতাটির জন্য তার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি। অথচ সমস্ত জানা সত্ত্বেও আমাদের তিনজনকেই নিজেদের অভিনয়গুলো করে যেতে হবে। তার তাঁবু থেকে বেরোনোর সময় ভাব্য আমার ডান হাতের শেষ আঙুলটা ধরল।
“তুমি দেখেছো, বৃদ্ধা যখন তোমাকে কথাগুলো বলছিল তখন ওর বাম কপালের একটা শিরা কেমন কাঁপছিল?”
হয়ত কিছুটা হলেও ভাব্যর মন খারাপ করছে। আমাদের জীবনের দেখা করার এই প্রথম রাতই আমাদের শেষ রাত হতে চলেছে। মেলার সময়টুকু। কোনও স্থায়ী সম্পর্ক আমরা দু’জনেই চাই না। বরং আমাদের বিচ্ছেদের একটি স্মারক হিসেবে এই দেখা করার দিনটি আমরা তুলে রাখতে চাই।
আজ রাতের দ্বিতীয় গল্পটি শুরু করি –
“এক জায়গায় বেশিদিন থাকতে পারি না আমি। মাঝে মাঝেই বাড়ি বদল করি। চব্বিশ বছর বয়সে সংবাদপত্রের চাকরি ছেড়ে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে চলে গেলাম শহর থেকে দূরে।শহর আমার মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল প্রবল প্রতিহিংসা। বহুদিন এমন কিছু লিখতে পারিনি যা আমাকে শান্তি দিতে পারে। শহর থেকে দূরে প্রকৃতির অনেক কাছাকাছি গিয়ে ভাবলাম এই শান্তিই আমার জীবনের গভীরতম লেখাগুলো বের করে নিয়ে আসবে। অথচ ভাবনায় কিছু ভুল ছিল। এত সুখের মধ্যে থেকে আমার মধ্যে লেখার ইচ্ছেটাই ধীরে ধীরে মরে যেতে লাগল। মনে হল কিছুই কাউকে জানানোর কোনও দায় নেই আমার।
সারা দুপুর বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে উঠোন থেকে খানিক দূরে গমক্ষেতের দিকে তাকিয়ে জীবনের এক আশ্চর্য সুন্দর রূপ দেখতে পেতাম। অথচ এভাবেই একটা দৃশ্যের মধ্যে ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছি আমি, এমন একটা বোধ রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে আমাকে আতঙ্কিত করে তুলত। বাড়ির মালিক কলকাতায় থাকেন। সচরাচর ওখানে যান না। ফলে গোটা বাড়িটায় একা আমি। দুপুরবেলার আলো যখন ধীরে ধীরে মরে গিয়ে বিকেল ঘনিয়ে আসত, তখন দেখতাম মেটে রঙের একটা টুপি পরে একটি লোক উত্তর-দক্ষিণ বরবার হেঁটে চলেছে। সারাদিনে এই একটি লোকের যাওয়াই আমার চেতনার মধ্যে জেগে থাকত।হয়ত বা বাঁচিয়ে তুলত আমাকে।
সেই লোকটি এতটা দূর দিয়ে যেত যে তার মুখ ভালো করে দেখা যেত না। শরীরের আকার প্রায় আমারই মতো, টুপিটি আকৃতিতে বেশ বড়। কোনওদিন আমার ইচ্ছেও করেনি তার সাথে গিয়ে পরিচয় করে আসি। এক দৃশ্যের ভালোলাগা হয়ে এমন ভাবে জেগেছিল লোকটি। অথচ দিনের পর দিন সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে অস্বস্তি শুরু হল আমার। মনে হল লোকটি একদিন না এলে খুব বাঁচা বেঁচে যাই। অথচ এমনটি হওয়ার ছিল না। ঠিক একইসময় একই পথ দিয়ে লোকটি উত্তর-দক্ষিণে হেঁটে যেত এবং একবারও থমকে দাঁড়াত না। দুপুরবেলা বাইরে বসা বন্ধ করলাম। তবে এই অসুখ যেন আমার মনের গভীরে বাসা বেঁধেছিল। জানলা দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে আমি লোকটির যাওয়া দেখতাম এবং অসুস্থ হয়ে পড়তাম।
ভাবলাম, লোকটির সঙ্গে গিয়ে একদিন কথা বললেই হয়ত এই অসুখটি কেটে যাবে।গমক্ষেতের মধ্যে দিয়ে তার যাওয়ার নির্দিষ্ট সময়ে অপেক্ষা করতে গেলাম একদিন। দেরি হওয়াতে উত্তর দিকে গেলাম, তর সইছে না আমার। লাভ নেই। অপেক্ষা করতে হবে।হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এলাম বাড়িতে আবার।
এরপর থেকে কোনওদিন আর সেই লোকটিকে দেখিনি। সকাল, বিকেল, রাতের পর রাত বারান্দায় বসে থেকেছি অথচ সেই লোকটিকে আর একবারের জন্য চোখে পড়েনি।
বাড়িওয়ালা একদিন এলে এই ঘটনার কথা তাকে জানাই। আমার মুখে গল্পটি শুনে তার মুখ খুব থমথমে হয়ে যায়। মনে হয় কিছু একটা গোপন করে যাচ্ছেন তিনি। বেশিদিন আর থাকা হয়ে ওঠে না ওখানে। নির্লিপ্ত শান্তির জীবনে মরে যেতে যেতে ফিরে আসি শহরে।
বাড়িওয়ালার সঙ্গেও যোগাযোগ থাকাটা স্বাভাবিক নয়। অথচ জায়গাটি আমার মনের মধ্যে রয়ে গেল। যেখানে কখনও নিজেকে ফেলে এসেছি সে জায়গায় বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে হয় আমার। বছর দুই পর একদিন ওই পথ দিয়ে ফেরার পথে গেলাম ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করতে। অথচ গিয়ে সেই বাড়িতে অচেনা একটি লোকের দেখা পেয়ে খুব আশ্চর্য হলাম। তিনিই জানালেন এই বাড়ির যিনি মালিক ছিলেন বছর দেড়-দুই আগে নিজের মাথায় গুলি চালিয়ে তিনি মারা গেছেন। শুনে বুক কেমন ফাঁকা হয়ে গেল। তবে কি আমার সেই ঘটনাটি শোনার পরপরই…!”
এই বলে খানিকক্ষণ চুপ করে থাকি। হাতের মধ্যে ধরা ভাব্যের হাতটি দেখি এই শীতের মধ্যেও ঘেমে উঠেছে। ওর গভীর দুটো চোখ আমার চোখের দিকে তুলে ধরা। ভাব্য জানে, গল্পটার এখানে শেষ নয়। গল্পটার এখানে যে শেষ নয় তা আমিও জানি। অথচ এর বাইরে আমি আর কিছুই জানি না। “তারপর কখনোই তার ফিরে যাইনি ওখানে। ভদ্রলোক মরলেন তার সঙ্গে আমার গল্পের কোনও যোগ নাই থাকতে পারে। শুনেছি স্ত্রীর সঙ্গে ওনার প্রবল অশান্তির মধ্যে কাটছিল।”
৩
শেষ অংশটি অনেকটা কৈফিয়তের মতো শোনাল। ভাব্য ঘেমে যাওয়া হাতটি কিছুটা শক্ত করে ধরে আমাকে চেপে ধরা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিল। গরম মুখোরোচকের দোকানগুলো পার হয়ে গিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম গুলি করে হাওয়াবেলুন ফাটানোর তাঁবুর দিকে। দশটাকায় দশটা বেলুন ফাটানোর সুযোগ দু’জনে ভাগাভাগি করে নেব স্থির হল। তিনটি নিশানায় লাগল আমার। ভাব্যর চারটি। দ্রুত ফুরিয়ে আসছে মেলা। বড় নাগরদোলাটির আলো ধীরে ধীরে নিভে গেল। দ্রুত ফুরিয়ে আসছে আমাদের সময়টুকু।সামান্য দর্শক আমরা জীবনের প্রেক্ষাগৃহে নিজেদের জীবনের শো দেখে চলেছি, বাদামভাজার দোকানটি পার করে রঙিন জল বকে ভরে বিক্রি করছে একটি বারো-তেরো বছরের ছেলে। ভাব্য একটা কাঁচের বক তুলে নেয়।
আমি সঠিক জানি না কাঁচের বকটি আমার জন্য নাকি ভাব্য নিজের জন্য কিনেছিল, যদিও আমাদের এমন সম্পর্কে পরস্পরকে কোনও উপহার দেওয়া উচিৎ নয়। মেলার মাঠ থেকে কিছুটা বার হয়ে এসে আমরা দাঁড়ালাম একটা অন্ধকার ঘেঁষে। কিছুটা সামনে সাবানের জল থেকে বুদবুদ উড়িয়ে বাচ্চাদের তাক তাকিয়ে দিচ্ছেন একজন ফেরিওয়ালা। সেগুলো উড়ে যাচ্ছে কিছুটা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এবং মিলিয়ে যাচ্ছে হাওয়ায়। সেই বুদবুদের মধ্যেই ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে মেলার আলোগুলো।
দৃশ্যগুলো কেমন ফ্রেমের পর ফ্রেম সরে যাচ্ছে আমাদের চোখের সামনে দিয়ে। কিছুটা সময়, তারপর জানি আর কখনই দেখা হবে না আমাদের। দু’হাতে কোমর জড়িয়ে রাখি ভাব্যর। সেও দুটো হাত দিয়ে আমার গলার চারিদিকে একটা শিকল তৈরি করে। আজ রাতে আমাদের শেষ অর্থাৎ তৃতীয় গল্পটা এখানেই শুরু হয়। গল্পটা যে কেউই শুরু করতে পারতাম, তবে গল্পটা শুরু করে ভাব্যই।
“জানো দীপ, বছর তিন আগে আমরা যে বাড়িটায় থাকতাম তার ঠিক পাশেই একজন বৃদ্ধ দম্পতি থাকতেন। একদিকে আমাদের বাড়ির ঝামেলা অপরদিকে তাদের বাড়িতে দিনরাত ঝগড়া আমার জীবনকে অস্থির করে তুলেছিল। অথচ ঝগড়াটি বেশিদিন রইল না। মায়ের কাছ থেকে জেনেছিলাম বৃদ্ধার কর্কটরোগ ধরা পড়েছে। শেষ অধ্যায়। বাঁচার দিনগুলো প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছে প্রায়। বৃদ্ধা জেনেছেন কিনা জানি না, তবে তাদের ঝগড়া চিরকালের জন্য বিদায় নিয়েছে বাড়ি থেকে। অসুস্থতার জন্য বৃদ্ধার হাঁটাচলা যখন প্রায় বন্ধ, তেমনই একদিন গেলাম তাকে দেখতে। দরজা খোলা। কাউকে ডেকে সারা না পাওয়াতে ঢুকে গেলাম ঘরে। বসার ঘর পেরিয়ে গিয়ে শোওয়ার ঘরে গিয়ে দেখি, বৃদ্ধ একটি ড্রপার নিয়ে বৃদ্ধার চোখের একফোঁটা জল সংগ্রহ করে তা একটি কাঁচের শিশিতে জমিয়ে রাখল। আমার পায়ের শব্দ শুনে কেমন কেঁপে উঠল বৃদ্ধ এবং খুব রেগে গিয়ে অহেতুক বকাবকি করে তাড়িয়ে দিল একপ্রকার।
এমন করার কোনও মানে খুঁজে পাইনি আমি। কেন এমন করছে বৃদ্ধ তা আমি দীর্ঘদিন ধরে ভেবেও কোনও উত্তর খুঁজে পাইনি। এই ঘটনার একুশদিন পর সেই বৃদ্ধা মারা যান। বৃদ্ধ লোকটি খুব কান্নাকাটি যে করেন এমন নয় বরং তার নির্লিপ্ত মুখ এতদিন ধরে জমিয়ে রাখা ধারণাটিই আরও বেশি স্পষ্ট করে তোলে আমার কাছে।
সেই বাড়িতেও বাবার দলের লোকেরা এলে আমি প্রায়ই ছাদে উঠে আসতাম। ছাদের দক্ষিণ কোণাটায় বসে থাকতে থাকতে আচমকা বৃদ্ধ লোকটিকে জানলা দিয়ে খুব অস্থিরভাবে পায়চারি করতে দেখলাম। তারপর একসময় বাইরের দিকে তাকিয়ে তিনি জোরে জানলার পর্দাটি নামিয়ে দিলেন। তার চোখেমুখে এক অসম্ভব ভয় দেখেছিলাম আমি হয়ত বা আশঙ্কা। পরের দিন সকাল হয়। শুনি, বৃদ্ধ নাকি পরদিন বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
অথচ বিষের কৌটোর সন্ধান কোথাও কেউ পায়নি। কী ধরণের বিষ সেই নিয়েও কোনও সঠিক তথ্য দিতে পারেননি কেউ।”
মেলার আলো প্রায় সব নিভে গেছে। আমাদের হাতদুটো আসন্ন বিচ্ছেদের শীতলতায় নাকি গল্পের জন্য জমে গেছে জানি না। অথচ আজ রাতের তিনটি গল্প আমাদের ফুরিয়ে গেছে।আমাদের কোনও গল্প নেই, পরস্পরকে বলার। এরপর আমাদের চিরবিচ্ছেদ। মেলার মাঠ যা এককালে কবরস্থান ছিল, সেখানে মেলা সমাপ্তির এক বিষাদ লেগে রয়েছে।ভাব্যর চোখ ছলছল।আমারও ইচ্ছে করছে না ভাব্যর হাতদুটো ছাড়ি। তবু যে কথা দিয়েছি, তা না মেনে চললে জীবন জটিল হয়ে পড়ে। যদি আমাদের জীবনে আরেকটি এমন মেলার রাত ও গল্প বাকি থেকে যায় তবে নিশ্চিত আবার কাছে আসা হবে। অথচ শেষ কিছু কি বলার আছে ভাব্যর? পরস্পরকে কিছুই কী দেওয়ার নেই আমাদের? একটি দীর্ঘ চুম্বন সমাপ্তিতে নিজেকে যথাসম্ভব সামলে ব্যাগের ভেতর হাত ঢোকাল ভাব্য।
ব্যাগ থেকে বেরিয়ে এল ওষুধের ছোট লাল রঙের শিশি।
“এটি রেখে দাও দীপ, আজীবন এই মুহূর্তের স্মৃতি হিসেবে।”
ওর গলার স্বরে যেন একটা ছুরি বসে যাচ্ছে।
“মায়ের চোখের জল অল্প অল্প করে কিছু জমিয়ে রেখেছি।”
বুকের ভেতর একটা চিনচিনে শীতল হাওয়া বয়ে গেলো উত্তর থেকে দক্ষিণে। যেন একটি মেটে রঙের টুপি পড়া লোক হেঁটে গেল একগুচ্ছ শীতল হাওয়া নিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে।ঠোঁটে একটি কথা এল না, শুকিয়ে গেল।
মেলার সমস্ত আলো নিভে গেছে। মাঠে নেমে এসেছে প্রাচীন কবরখানার মতো নিস্তব্ধতা।শুধু জ্বলে আছে ভাব্যর দুটো কালো চিতাবাঘিনীর মতো চোখ। ভাব্যর হাত থেকে নখ বার হয়ে এসে আরও আঁকড়ে ধরছে আমার হাতদুটো।
আমি ওষুধের মতো ছোট লাল শিশিটি পকেটের ভেতরে রেখে আসি। যেন জাদুকর তার খরগোশকে লুকিয়ে রাখল টুপির অনেক গভীরে।
