লেখা: তারিকুল ইসলাম শাওন ।
সালেহা হ্যারিকেনের দম কমিয়ে শুয়ে পড়তেই একটা ঘুমঘুম পুরুষালি শরীরের ফাঁদে জড়িয়ে যাচ্ছিল প্রায়, আর অমনি পেছনের খিড়কিতে সন্দেহজনক শব্দ। এক ঝটকায় সমস্ত ফাঁদ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে বসল। পেছনের বারান্দায় মাজা অবধি পোক্ত কাঠের পাঁচিল তোলা। ওখানেই কারা যেন ভারি ভারি পা ফেলে ছুটাছুটি করছে। একটা গমগমে ভাব, বোঝাই যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে আবার মজবুত হাতে চাপড়ে দিচ্ছে খিড়কির পাল্লা। সালেহার ঘুম বড়ো পতলা। গাছ থেকে পাতা খসে পড়লেও কান খাড়া হয়। কিন্তু এটা কোনও পাতা খসার শব্দ নয়। বাড়াবাড়ি রকমের হট্টগোল। ধাক্কা খেয়ে প্রেম ও ঘুম দুই-ই বিসর্জনে। সালেহা বিস্ফারিত কণ্ঠে হাঁক ছাড়ল, ‘ক্যেডা ওইহানে ?রাইতের বেলা মরণের আর জায়গা পাও নাই নাকি হ্যাঁ?’ না!কোন সাড়া আসলো না। সন্দেহ আরো গাঢ় হল।
লাগাতার ছুটাছুটি করেই চলেছে বারান্দায়। রাগে গজগজ করতে করতে বিছানা ছেড়ে বাঁ হাতে হ্যারিকেনের বেশ খানিকটা আলো উস্কে পেছনের দিকে পা বাড়াল। গ্রামের বেটি আলাদা করে সাহসের দৃঢ়তা প্রমাণ দিতে হয় না। স্বামী মরেছে প্রথম যৌবনে। এক ফাল্গুনে বিয়া- আরেক ফাল্গুন আইতে না আইতেই স্বামীর মরা মুখ। বড়ো সোহাগের স্বামী আছিল। জীবনবল্লভ বিয়োগে ভেবেছিল, এই বুঝি সব শেষ।কিন্তু এই অবধি তো একাই সামলাচ্ছে সবটা।খুট শব্দে খিল খুলে যেতেই মুণ্ডুটা বাইরে এগিয়ে দিল সালেহা। অবাক কান্ড! কোথাও কিচ্ছু নেই।কেমন নিস্তব্ধ নিরীহ পরিবেশ।
এপাশ ওপাশ ভালোভাবে চোখ আঁচড়াল। নাহ কিছু না। আশ্চর্য!সালেহা চোখ কছলালো। মাত্রই তো সব কেমন ওলোটপালোট করবার মতো। লোকের ছুটোছুটি, হৈচৈ অবস্থা। তবে এখন কোথায়? কি জানি রে বাবা! মনের ভুল? হতে পারে। আপনা আপনি মনে একটা সায় চলে এলো সালেহার। ছোট একটা হাই তুলে ফিরে আসার তাল করছে অমনি চোখ পড়ল, ঘরের দাওয়া ছাড়িয়ে সামনের আকাশের এক অংশের দিকে।আলকাতরা লেপানো আকাশে কয়েকটা হলদেটে আলোর ফুটকি। না! কয়েকটি নয় অনেকগুলো। প্রথম দেখায় অল্পসংখ্যকই মনে হয়। কিন্তু ভালোভাবে লক্ষ্য করলে, দেখা যাবে হাজার হাজার আলোক বিন্দু জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। নিমিষেই মনটা নির্বোধ হয়ে যায়। অজানা এক ভালোলাগা বুকের বাঁ দিকটায় আছড়ে পড়ে। সালেহা আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইল।
অল্প অল্প বাতাস দিচ্ছে। সামনের কোঁকড়ানো চুল গুলো মৃদু দোল খেতে খেতে চোখের উপর বিছিয়ে পড়েছে। একটা শিরশিরে অনূভুতি। যে অনূভুতি জীবনের সমস্ত অতীত স্মৃতি রোমন্থন করে। নিলামে উঠা বাড়িতে সাজিয়ে রাখা তৈজসপত্রের ওপর থেকে যেভাবে কালো কাপড় এক ঝটকায় সরিয়ে দেয়া হয়। তেমন করেই সমস্ত অতীত স্মৃতিগুলোর ওপর থেকে পর্দা সরিয়ে ফেলার মত। ঠোঁট দুটো তিরিতিরি কাঁপছে। শিরশিরে অনূভুতিটা বেড়েই চলেছে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। চোখ দুটো নিঃস্ব হবার যোগার। অন্ধকারের আকাশ এত মায়াবী হয়? কই কখনো তো এমন ভাবে দেখা হয়নি। আর হঠাৎই সবকিছু কিরকম ভন্ডুল হয়ে গেল মুহূর্তে। আবার সমস্ত কিছুর পরও কেমন দ্রুত কালো পর্দা জড়িয়ে গেল। সালেহা বিস্বাদ মাখা একটা দীর্ঘশ্বাস পুরোপুরি গিলে নিয়ে, কী মনে ক’রে কে জানে? সজোরে খিড়কির পল্লা দুটোকে দরাম শব্দে ভেজিয়ে দিল।
রক্তশূন্য হাতে কোনওমতে খিল তুলে বিছানায় এগিয়ে আসবে অমনি। কিরকম একটা দুর্গন্ধে গা গুলিয়ে উঠল সালেহার। চার দেওয়ালে বদ্ধ বিশ্রী ভ্যাপসা গন্ধ। হুট করেই এমন বিকট গন্ধে প্রাণ একেবারে ওষ্ঠাগত ।নাকের ওপর কাপড় ঠেসে কোনও মতে বিছানার দিকে এগোতে লাগল। বিছানার কাছে যতই এগোচ্ছে ততোই যেন দুর্গন্ধটা নাকের ভেতর দিয়ে গলা দিয়ে নামছে। বমি আসবার যোগাড়। মাথা ঘুরছে। হঠাৎ করে এমন দোচালা ঘরটা থমথমে হয়ে যাবার কারণ খুঁজতে লাগল সালেহা। আলো বাড়ানোয় হেরিকেনের কাঁচটা কালিতে পুরু হয়ে আছে। তীব্র গন্ধটা তখনও নাকে লাগছে খুব। লণ্ঠনটাকে মুখের কাছে তুলে ছোট্ট একটা ফুঁ দিতেই ফরফরিয়ে জ্বলা শিখাটা দপ করেই বুঢে গেল। মুহুর্তেই ঘুটঘুটে অন্ধকার যেন জেঁকে ধরলো পুরো ঘরটাকে।বিছানার কাছে পৌঁছতেই একটা ফিসফিসে ঠাণ্ডা গলার স্বর শুনতে পায় সালেহা,‘শালুক ও শালুক। আমি আইছিরে শালুক’।
সালেহার বুকের ভেতর সজোরে কে যেন সপাং সপাং করে চাবুক ছুড়ে ফেলেছে। চাবুকের প্রত্যেকটা আঘাত যেন গেঁথে যাচ্ছে সমস্ত শরীরে। এ যে তার স্বামী। মতিন। ধীরে ধীরে ভয়টা কেটে যাচ্ছে। জীবনের সমস্ত কষ্ট যেন গলার কাছে এসে আটকে পড়েছে। মুখ দিয়ে আর একটা কথাও বের করতে পারছে না সালেহা। কাটাকাটা গলায় বলল, ‘আপনে? আপনে তো মইরা গেছেন। ফিরা আইলেন ক্যামনে? নাকি আমি স্বপন দেখতাছি। আপনে সত্যি আইছেন?’ সালেহার চোখে জল চিকচিক করছে। ‘হ আইছি। তোরে দেখবার লাগি। কত্তো দিন তোরে দেহিনা রে।’ গলার স্বর আরও চাপা করে বললো, ‘শালুক, যাবি….?’ ‘আমার বিশ্বাস হয় না। আমি আপনারে একটু ছুঁইয়া দেখমু। কোই আপনে? কোই?’ সালেহা টকটকে অন্ধকারে সামনের দিকে হাত এগিয়ে দিল। ফিসফিসে গলাটা এবার বলে উঠলো, ‘এদিকে আয়,আয় এই দিকে। এই ,এই তো। আমার হাতটা ধর।’ সালেহার হাতটা কিসের সাথে ঠোকা খেতেই চমকে উঠলো। ধড়ফড়িয়ে আবার পিছনে ছিটকে এলো। একটা লোমশ বরফের মতো শিতল লোহার সাথে সালেহার হাত ঠেকেছে। আচমকাই একটা চিৎকার দিয়ে উঠল সালেহা। কি বীভৎস অনুভূতি।এটা কী? আর সাতপাঁচ না ভেবে দ্রুততার সাথে লণ্ঠনটাকে জ্বালতে চেষ্টা করছে। কিন্তু সামনের অন্ধকার থেকে গমগমে কন্ঠে এগিয়ে এলো ‘নারে শালুক, না। আলো জ্বালাস নে। আলোতে আমার বড়ো ডর লাগে। জ্বালাস নে। আমি যে তোরে নিতে আসছি। আমারে তাড়াস নে।’ সালেহা কোন বারন না শুনেই চেষ্ঠা চালিয়ে গেল।
এক সময় দপ করে জ্বলে উঠতেই লণ্ঠনটাকে সামনে উঁচিয়ে ধরলো। আর তার সঙ্গে সঙ্গে হালকা আলোয় যা দেখলো তাতে সালেহার হাড় হিম হয়ে গেল।একটা বিশাল মানব আকৃতি, যার আগাগোড়া সাদা লোমে ঢাকা। মুখমণ্ডলের স্থানে একটা থকথকে পদার্থে ভর্তি। রক্ত? হতে পারে, এইটুকুন আলোয় ঠিক ঠাহর হচ্ছে না। চোখ দুটো যেনো জ্বলন্ত আগুনের ফুলকি। এক্ষুনি জ্বালিয়ে ছাই করে দেবে সব। মুখের ভেতর থেকে হাজার হাজার ছোটো পোকা ঘনঘন করে বেরুচ্ছে।সালেহার হৃৎপিণ্ডটা ছিটকে গলার কাছে চলে এসেছে। গোঙাতে গোঙাতে কাঁদতে লাগলো সালেহা। পাথুরে দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে সবটা। ধীরে ধীরে নিচ থেকে মুছে যেতে লাগলো মানব আকৃতির দানবটা। একটা সময় দানবটা চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে বাতাসের সাথে ঘরের কড়িকাঠের উপর দিকে গিয়ে মিলিয়ে গেল। সদ্য নিভে যাওয়া প্রদীপের সলতে থেকে মৃদু ধোঁয়া এঁকে বেঁকে বিলিন হয়ে যাওয়া মতো।
সালেহার চোখের সামনেই ঘটল গোটা ব্যাপারটা। বুকের ভেতর কেমন ঢিপঢিপ করছে। নাহ্! এখন আর গন্ধটা নেই। আতঙ্কে সালেহার পা টলছে। গোটা ব্যাপারটা দ্বিতীয়বার ভাবতেই মাথায় ভেতরটা চক্কর দিয়ে উঠল। নিজেকে আর সজাগ রাখতে পারল না। সম্বিত হারিয়েছে। হেরিকেনটা সশব্দে নিচে পড়ে গেল, তার সঙ্গে সঙ্গে সালেহাও। কেরোসিনের গন্ধে ভরে উঠেছে ঘরের ভেতরটা। সালেহার আঁচলটা তেলে ভিজে চুপচুপে। তখনও আছড়ে পড়ে থাকা হ্যারিকেনটা মৃদু আঁচে টিপটিপিয়ে জ্বলছে। ঘরের কড়িকাঠের উপর থেকে কেউ একজন অপেক্ষা করছে শেষ দৃশ্যটা দেখার। দীর্ঘদিন পর আবার একসাথে থাকবার। এবার আশা পূরণ হওয়ার পালা।
