“আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে…”
“……আমাদের ছোট লদি চল্যা এঁকেবেঁকে
বৈসাখ মাসে তার হাটু জল থাক্যা…”
ছোট দিদিমণির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সবাই দুলে দুলে পড়ছে রবি ঠাকুরের কবিতাখানি। পড়ার থেকে শুনে শুনে উচ্চারণ করছে বলাই বেশি যুক্তিসঙ্গত হবে। এখনও অনেকেই ঠিক মতো পড়তে শেখেনি। যুক্তাক্ষরগুলোকে এখনও অনেকের ভিনগ্রহের জীব বলেই মনে হয়।
ছোট দিদিমণি মানে সুস্মিতা দেব অবশ্য এসব বিষয়ে বেশি মাথা ঘামান না। তবে তিনি দায়িত্ব পালনেও কোনও ত্রুটি রাখেন না। যথা সময়ে সিলেবাস শেষ করেন। মাঝেমধ্যেই ঘরের কাজ দেন। রোজ রোজ দেন না, তাহলে হয়তো অনেকে স্কুলে আসাই বন্ধ করে দেবে। তার অতি বড় শত্রুও তাঁকে কড়া শিক্ষিকার তকমা দিতে পারবে না। রোজ রোজ খাতা দেখা বা পড়া না করলে একটু আধটু শাস্তি… এসব অন্যায় কাজকর্ম তিনি কদাচ করেন না। আর তাই তার ক্লাসে ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতির হার বড় দিদিমণিকে সদা প্রসন্ন করে।
সরলাবালা অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীর এক এবং একমাত্র বিভাগের শ্রেণীকক্ষটি লম্বায়-চওড়ায় নেহাত মন্দ নয়। পাপড়ি ওঠা নীলচে দেওয়াল ঘেঁষে দুই সারিতে নাই নাই করে হলেও গোটা চোদ্দ বেঞ্চ রয়েছে। না, হতেই পারে সেগুলো তেল চিটচিটে, নড়বড়ে বা অনেকেই চার পায়ের বদলে তিন, সাড়ে তিন পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবু বসা তো যায়! তেমনই ছাল ওঠা হলেও একখানা বড় ব্ল্যাক বোর্ডও রয়েছে। যদিও বছরের পর বছর কলি ফেরানো হয়নি বলে সে ব্যাটা কিঞ্চিৎ ফর্সা হয়ে গেছে। তবে এতসবের মধ্যেও দিদিমণির বসার চেয়ারটা কিন্তু একদম বহাল তবিয়তে রয়েছে।
গোটা চল্লিশেক শিক্ষার্থী এক তালে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে পদ্য আওরে যাচ্ছে। তাদের তেল চিপচিপে চুল, আর হলদে ছাপ ধরা সাদা ইউনিফর্মের মধ্যে বেশ একটা মেলবন্ধন রয়েছে। সবাই যেন একই রকম। মুখগুলো না দেখলে মনে হবে কেউ যেন কম্পিউটারে কপি পেস্ট করে দিয়েছে।
বাঁদিকের লাস্ট বেঞ্চের আগের বেঞ্চের একদম কোণায়, জানলার ধারে বসা হাবুলের আজ অবশ্য পদ্যে তেমন মন নেই। অন্যদিনও যে খুব একটা থাকে তা নয়, তবে আজকে তার মনটা একটু বেশিই লাগামছাড়া। তাই সবার সাথে মাথা দোলালেও ছোট নদী তার মাথার আশেপাশেও ঘেঁষতে পারছে না।
কচি সজারুর কাঁটার মতো খোঁচা খোঁচা চুল আর হলদে ছোপ ধরা দুটি বৃহদাকার কৃন্তনদন্ত, যারা কখনোই ওষ্ঠ অধরের শাসনকে গ্রাহ্য করে না, হাবুলের শনাক্তকরণ বৈশিষ্ট্য। সেই হাবুলই শত চেষ্টা স্বত্বেও আজ নিজের মনকে শ্রেণিকক্ষের চারদেওয়ালের মাঝে আটকে রাখতে পারছে না। তার অশান্ত মন দুটো চকচকে চোখের মাধ্যমে জানলার বাইরে স্কুলের একলওতা মাঠের দিকে চলে যাচ্ছে বারবার। সাধের জিনিসগুলির দর্শন পেতে উদগ্রীব হয়ে উঠছে।
হাবুল রুইদাস, বছর সাতেকের শিশু। সরলাবালা অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীর ছাত্র। হ্যাঁ, বয়সের বিচারে তার নিদেনপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়া তো উচিতই ছিল। কিন্তু সে যে ইস্কুলের মুখ দেখতে পেয়েছে, এটাই অনেক বড় কথা।
হাবুলের বাড়ি বাঁকুড়া জেলার প্রত্যন্ত বনকাঠি গ্রামের একদম শেষ প্রান্তে। বাড়ি বলার চেয়ে ঝুপড়ি বলাই ভালো। বাখারির তৈরি এক চিলতে মাথা গোঁজার ঠাই। গ্রীষ্মের দাবদাহ গরমে যার টিনের ছাদ আগুনের গোলা বর্ষণ করে। যার অজস্র ফুটোফাটার কল্যাণে বর্ষাকালে বাইরের চেয়ে ঘরের ভেতর বেশি বর্ষণ হয়।
হাবুল তার বাবাকে তার এই নাতিদীর্ঘ জীবনে বার দশেক দেখেছে। তার বাবা সদরের ফুটপাথে বসে জুতো সেলাই করে। ওটাই ওদের সাতপুরুষের ব্যাবসা। বছরে এক দু’বার বাড়িতে আসে।
সেদিন ছোট দিদিমণি ক্লাসে বাবা, মায়ের প্রতি সন্তানের কর্তব্য নিয়ে পড়াচ্ছিলেন। ছেলেমেয়েদের নাকি উচিত সবসময় বাবা-মাকে সম্মান করা, ভালোবাসা, তাদের কথা শুনে চলা। হাবুল সে সব শুনে বুঝতেই পারল না, যে সে তার বাবা-মাকে আদৌ ভালোবাসে কিনা। যে মানুষটাকে সে ভালো করে চেনেই না, তাকে ভালোবাসবে কেমন করে সে বুঝে উঠতে পারে না।
আর মায়ের কথা বলতে গেলে তার শুধু ঝাঁটা হাতে মায়ের রুদ্রমূর্তির কথাই মনে পড়ে। আকছার সে মায়ের হাতে বেদম পেটানি খায়। কোনও দিন ঝাঁটা, কোনদিন খুন্তি, কোনদিন বা জুতো। এ সব কিছুই হাবুল আর হাবুলের মায়ের সম্পর্কের মধ্যে সেতুবন্ধন করে। তাই মাকে সে বেশ সমীহ করেই চলে, কিন্তু ভালোবাসা ব্যাপারটা নিয়ে তার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
বাংলা শেষ করে দিদিমণি অংকের ক্লাস শুরু করলেন। চেয়ার ছেড়ে উঠে খসখসে বোর্ডে ক্যাঁচকোচ শব্দে যোগ লেখা শুরু করলেন। সতেরো যুক্ত বারো, উনিশ যুক্ত তেইশ… প্রায় গোটা দশেক যোগ লেখার মতো মারাত্বক পরিশ্রমের ফলে হাঁপিয়ে গিয়ে বসে পড়লেন। এবার শিক্ষার্থীদের পালা। করুক এগুলো বসে বসে, ততক্ষণ তিনি একটু জিরিয়ে নেবেন। এখনকার সময় হলে হয়তো আ্যন্ড্রয়েড ফোনে একটুখানি সমাজ মাধ্যমের অলিগলিতে উঁকি দিতেন। কিন্তু এই কাহিনি বেশ কিছু বছর আগেকার। তখন বোতামওয়ালা ফোনই সবার হাতে এসে পৌঁছায়নি। অগত্যা ওই তন্দ্রাটুকুই ভরসা।
যোগগুলো খাতায় টুকতে শুরু করল, সবাই নয় অনেকে। বাকিরা ততক্ষনে গুলতানি আর খেলা শুরু করে দিয়েছে। গুঞ্জন নির্দিষ্ট ডেসিবেল মাত্রা ছাড়ালেই ছোট দিদিমণির নিরামিষ হুঙ্কার ভেসে আসছে। একটুক্ষণের নৈঃশব্দ তারপর আবার যে কে সেই।
হাবুলের পাশে বসা পিন্টু আর রাজা স্কেল নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শুরু করে দিয়েছে, হাবুলকেও ওরা দলে টানার চেষ্টা করল। হাবুল মাথা নেড়ে গা মোচড়ালো। আজ তার খেলাতেও মন নেই। ঘাড়টা বেঁকিয়ে জানলার মরচে ধরা শিকের ফাঁক দিয়ে মাঠের দিকে তাকালো আরেকবার। মাঠের এক কোণে অতিকায় একটা গামলায় রান্না বসেছে। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা বাসন-কোসন, মশলা-পাতি। একটা নীল ড্রামে জল ভর্তিকরে রাখা। জবা কাকিমা খুন্তি দিয়ে এক মনে ঘেঁটে যাচ্ছে গামলার ভেতরটা। লতাদিদি একটা তালপাতার পাখা দিয়ে উনুনের গর্তে হাওয়া করে যাচ্ছে প্রাণপন।
মুখটা ব্যাজার হয়ে গেল হাবুলের। এখনও তো চাল-ডালই ফুটে যাচ্ছে, আসল জিনিসটা আসবে কখন!
হাবুলের মা লোকের জমিতে মজুর খাটে। তাও বারো মাস কাজ পায় না। নিচু জাত বলে সবাই কাজ করতেও ডাকে না। ওই কোনও মজুর অসুস্থ হলে বা কাজে না আসতে পারলে, তবেই ডাক পড়ে হারানীর। হাবুলের বাবার পাঠানো টাকাকটা দিয়েই দিন গুজরান হয় মা-ব্যাটার।
উনুনের আঁচটা ভালোই ধরেছে। লতাদিদি পাখা রেখে উঠে দাঁড়াল। দূরের সিমেন্টের বেদীটার উপর বসে হাঁপাচ্ছে। হাবুল চোখদুটো সরু করে ভালো করে দেখল, লতাদিদির পেটটা কেমন ফুলো ফুলো লাগছে না? তাহলে কি ওর মায়ের মতো লতাদিদিও বাচ্চা বিয়োবে!
বেশ খুশিই হল হাবুল। ওর মা নয় মাসের গর্ভবতী। ইয়া বড় হয়েছে পেটটা। হাবুলের খুব ইচ্ছে একটা বোন হোক। যদিও মা শুধু ছেলের কথাই ভাবে। ওর দিদিটা ওকে বড় ভালোবাসত। কেমন আগলে আগলে রাখত, মায়ের হাতে মার খাওয়া থেকেও বাঁচাত। লুকিয়ে লুকিয়ে চৌধুরীদের বাগান থেকে কাঁচা আম এনে খাওয়াত। পুকুরপারে বসে দুই ভাইবোনে কাঁচা লংকা আর নুন দিয়ে মেখে খেত কষকষে টক আমগুলো। সে বেশি ঝাল খেতে পারে না বলে তার ভাগেরটা আলাদা করে রাখত দিদি।
দিদির কথা মনে পড়লেই একমাত্র মন খারাপ করে হাবুলের। গেল বছর কালাজ্বরে মরে গেল দিদিটা! বছর দশেকের মেয়েটাকে পুড়িয়ে এসে তার বাপটাও খুব কেঁদেছিল।
দাদার কথা তো মনেই পড়ে না হাবুলের। তখন তার বয়স চারও পেরোয়নি, তাই ওর মুখটাও ওর মনে নেই সেভাবে। সাপে কেটেছিল তেরো বছরের ছেলেটাকে। তাকে কলার ভেলায় নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল এটুকুই শুধু মনে আছে হাবুলের।
পেল্লাই একটা হায় তুললেন ছোট দিদিমণি। খানিকক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার ফলে শরীরটা বেশ তরতাজা লাগছে। এতগুলো বাচ্চাকে সামলানো কি মুখের কথা! একটু-আধটু না জিরোলে শরীর থাকবে!
আলগা আড়মোড়া ভেঙে সবাইকে চুপ করালেন। সামনের বেঞ্চদুটো থেকে গোটা চারেক ছেলেমেয়ে খাতা দেখাতে ভিড় করেছে। ওদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
বাইরে তখন খিচুড়ির সুগন্ধ বেরোতে শুরু করেছে। আলু, মুলোর সঙ্গে চাল-ডালের মাখোমাখো রসায়নের সুঘ্রাণ অনেকেরই চিত্ত চাঞ্চল্যের কারণ হয়ে দাঁড়াল। দু’চার জনের পেটের ভেতর মোচড় দেওয়াও শুরু হল বোধহয়।
প্রাণ ভরে গন্ধটুকু নিল হাবুল। আহঃ এই জন্যই তো ইস্কুলে আসা। ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে, তিন কিলোমিটার পায়ে হেঁটে পাশের গ্রামের ইস্কুলে আসতে যে কষ্টটা সে রোজ করে, এটাই তো তার কারণ।
হাবুলের দাদা-দিদিরা কেউ ইস্কুলের চৌকাঠ মারায়নি। যাদের দু’মুঠো ভাত জোটে না, তাদের আবার লেখাপড়া! হাবুলের কপালটাই যা সোনা দিয়ে বাঁধানো। না হলে মাস দু’য়েক আগে অঙ্গনওয়ারীর দিদিরা তাদের ঘরেই বা আসতে যাবে কেন! স্কুলে ভর্তি করার কথা বলতেই তো মা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছিল। তখনই দিদিরা বলল আসল কথাটা। পড়তে গেলেই নাকি খেতে পাবে। রোজ। বইখাতাও সব ইস্কুল থেকেই দেবে।
মায়ের তো শুনে বিশ্বাসই হয় না। এমন কথা কেউ কোনওদিন শুনেছে নাকি, পড়তে গেলে খেতে দেবে? দিদিরা সব বুঝিয়ে বলল। কী যেন মিড ডে মিল না কী! সরকার পয়সা দিচ্ছে সবাইকে পেট পুরে খাওয়ার জন্য। ব্যস, মা তো এক কথায় রাজি। অন্তত একবেলার জন্য হলেও একটা পেট তো কমলো, তাই বা কম কি!
সেই থেকে শুরু। ঘরের বাসি টোকো পান্তার বদলে রোজ গরম গরম ভাত তার কপালে জুটছে। তাদের পেট চালানোর জোগারের কাছে স্কুলের খাবার তো স্বর্গ। কোথায় শুশনি শাক সেদ্ধ, গেঁড়ি-গুগলির তেল ছাড়া তরকারি, কোনওদিন আবার ভাতের অভাবে শুধু কলমি শাক সেদ্ধ আর কোথায় গরম গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, ডাল, সবজি বা খিচুড়ি। গলা অবধি ঠুসে নেয় সে, যাতে রাতের আগে ক্ষিদে না জ্বালায়। দিদিমণিকে ঘিরে জটলা তৈরি হয়েছে। কানু, সুবাস, লক্ষ্মী, হেতাল সব খাতা দেখাতে ভিড় জমিয়েছে। ওদের অবস্থা হাবুলের থেকে অনেকটাই ভালো। তাই হয়তো ফুটন্ত খিচুড়ির গন্ধটা অংক খাতা পেরিয়ে ওদের নাকে ঢুকছে না।
খিচুড়ির গামলাটা নামিয়ে রাখল জবাকাকিমা। মাঠের পাশের যে ছোট্ট ঘরটাতে রান্নার জিনিষ রাখা হয়, ওদিকে চলে গেল। হাবুলের বুকের ভেতর ধুকপুকুনি বেড়ে গেল। এবার কি আসবে? ওর এত দিনের ইচ্ছে পূরণের দেখা কি এবার ও পাবে?
গত আড়াই-তিন মাসে ভাত, ডাল, আলুর ঘ্যাঁট বা খিচুড়ি ছাড়া আর কিছু পাতে পড়েনি হাবুলদের। যদিও ওটাই ওদের কাছে অমৃতের সমান, কিন্তু সপ্তাহ দু’য়েক আগে শহর থেকে বড় দিদিমণির মেয়ে দেখা করে যাওয়ার পর থেকে হাবুলের মনে আনন্দের জোয়ার এসেছে। ওই দিদি যে বলে গেছে, তার জন্মদিনে স্কুলের সব্বাইকে খিচুড়ির সাথে ডিম সেদ্ধ খাওয়ানো হবে। ডিম সেদ্ধ খাওয়ার স্বপ্ন দেখাও হাবুলের সাধ্যের বাইরে। ইহজীবনে সে গুনে গুনে বারতিনেক ডিম খেয়েছে। একবার বোসদের বাড়িতে বালক ভোজনে, আরেকবার বাবা কিনে এনেছিল পুজোর সময়, আরেকবার কোনও এক মন্ত্রী ভোট প্রচারের পর ডিমভাত খাইয়েছিল। ওর মা নিজে না খেয়ে হাবুলের জন্য নিয়ে এসেছিল।
বাইরে সাদা, ভেতরে হলুদ ওই বস্তুটির উপর হাবুলের সাংঘাতিক লোভ। বাইরের নরম সাদা কুচকুচে পরতের নীচে তুলতুলে কুসুমের স্বাদ মনে করলে হাবুলের জিভে বাণ আসে। আর তাই যবে থেকে এই সুসংবাদটা তার কর্নগোচর হয়েছে, তবে থেকেই তার জিভ সুরসুর করতে শুরু করেছে। রাতেও মাঝেমধ্যে ঘুমের মধ্যে ডিম সেদ্ধ খাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
দীর্ঘ পনেরো দিন অপেক্ষার পর আজ সেই শুভদিন। সকালের প্রার্থনার পরেই বড় দিদিমণি ঘোষণা করেছেন আজ তার মেয়ের আঠেরো বছরের জন্মদিন। আর সেই মেয়ের ইচ্ছায় আজ স্কুলের সব পড়ুয়াদের ডিম সেদ্ধ খাওয়ানো হবে।
ব্যস, আর যায় কোথায়! হাবুলের সকল ধ্যানজ্ঞান ওই দিকেই পড়ে রয়েছে। সকল ইন্দ্রিয় যেন ওই একটা ভাবনাতেই নিমজ্জিত। আজ যেন সময়ের কাঁটা অন্যদিনের চেয়ে অনেক ধীরে ধীরে চলছে। কখন ছুটি হবে? কখন সে স্বাদ নেবে তার আকাঙ্খিত খাদ্যের!
সকাল থেকেই সে মাঠের দিকে চেয়ে রয়েছে। কখন দেখতে পাবে ওগুলোকে। বড় কড়াইয়ে গুবগুব করে সেদ্ধ হবে।
হাবুলের মনকে শান্তি দিতে স্বর্গের দূতের মতো ভাঁড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এল জবাকাকিমা। হাতে গোটা চারেক ডিমের ক্যারেট, একটার উপর আরেকটা বসানো। পিছনে পিছনে লতাদিদিও এল, আরও কয়েকটা ক্যারেট নিয়ে।
চোখগুলো চকচক করে উঠল হাবুলের। মনের ভেতর উথাল-পাথাল আনন্দ। ওই তো… ওই তো সেই বস্তু। যার জন্য এতদিন ধরে অপেক্ষা করে রয়েছে সে। গোল গোল, সাদা সাদা! ক্যারেট থেকে বেরোচ্ছে আর জল ধোয়া হয়ে সোজা কড়াইয়ের ভেতর ফুটতে থাকা জলের ভেতর ডুবে যাচ্ছে।
আনন্দে ছটফট করে উঠল বছর সাতেকের শিশুটি। ভেতরে ভেতরে খানিকটা অধৈর্যও হয়ে পড়ল। ধুসস্! কখন যে ছুটি হবে। আর কত দেরি!
ধীরে ধীরে ছোট দিদিমণির সামনের ভিড়টা পাতলা হয়ে এল। কমলা আর ভোম্বল দু’জন কেবল দাঁড়িয়ে আছে খাতা নিয়ে। ওদের খাতা দেখা শেষ হলেই হয়তো ঘন্টা পড়ে যাবে। নিজের মনকে নিজেই শান্ত করার চেষ্টা করল হাবুল। বেঞ্চের নীচ থেকে আস্তে আস্তে টেনে নিল আধময়লা কালচে ব্যাগটা। বই-খাতা গোছাতে শুরু করল। বাংলা খাতাটা সবে ব্যাগে ঢোকাতে যাবে তার আগেই একটা মেয়েলি কান্নার শব্দ ওর কানে এল।
শব্দটার উৎস ধরে চোখ চালাতেই হাবুল চমকে উঠল। একি! এ যে ক্ষেন্তিমাসি। ওদের ঘরের দুটো ঘর পরে থাকে। ওর ইস্কুলে কী করছে?
একজন অচেনা মানুষকে ক্লাসের ভেতরে দেখে সবাই থমকে গেছে। তার উপর মহিলা রীতিমতো ফোঁপাচ্ছে। সবাই চুপ। ছোট দিদিমণি ওকে নিয়ে দরজার বাইরে গেলেন।
কেউই কিছ বুঝে উঠতে পারছে না। ফিসফিস করে গুঞ্জন শুরু হয়েছে আবার। হাবুল এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে বই-খাতাগুলো ব্যাগে পুরে নিল।
মিনিট পাঁচেক পরেই দিদিমণি ভেতরে ঢুকলেন। ক্ষেন্তিমাসি বাইরেই দাঁড়িয়ে। ভেতরে ঢুকেই ছোট দিদিমণি ডাক দিলেন, “হাবুল রুইদাস কে আছিস? এদিকে আয় তো?”
ছোট দিদিমণির মুখে নিজের নাম শুনে পিলে চমকে গেল হাবুলের। থতমত খেয়ে কোনও রকমে হাত তুলল।
“ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আয়।” নির্দেশখানি ছুঁড়েই দিদিমণি বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
গুটিগুটি পায়ে বেঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে এল হাবুল। মনে একরাশ প্রশ্ন। খানিকটা ভয়ও। কী করেছে সে, কেন তাকে ডাকছে? তাও ব্যাগ নিয়ে? ইস্কুল থেকে বের করে দেবে না তো? তার তো ইস্কুলে আসার আগে অক্ষর পরিচয়টুকুও ছিল না। এখানে এসেই সব শিখেছে। তাই ঠিক মতো পড়াগুলো ধরতে পারে না সে। অংক, বাংলা সবই কেমন পিছলে পিছলে যায়। সে কথা কি ধরে ফেলেছে দিদিমণি? আজই কি তার এখানে শেষ খাওয়া? খিচুড়ি, ডিম সেদ্ধ দিয়েই কি তার সুখের জীবনের ইতি ঘোষণা হবে?
ক্লাসের সবকটা চোখ তখন হাবুলের দিকে। যেন সে ভীষণ কোনও অপরাধ করে ফেলেছে। সবার চোখের প্রশ্নের ছোঁয়া বাঁচিয়ে ধীর পায়ে ক্লাস থেকে বেরোল হাবুল।
দরজার বাইরে দিদিমণির সাথে কথা বলছে ক্ষেন্তিমাসি। চোখদুটো ছলছল করছে। মুখটায় কেমন ভয় ভয় ভাব। হাবুলকে দেখেই জড়িয়ে ধরল ক্ষেন্তিমাসি। নতুন করে ফোঁপাতে শুরু করল, “শিগগির ঘর চল কেনে… তুর মা টোর ব্যাথা উটেছে। দাই মাসি গেরামে লাই। উয়াকে বলকের হাসপাতালটোতে লিয়ে যেতে হবেক। খুব ছটফটাইনছে। বেসি সময় লাই। তুয়াকে দেইকবার লিগ্যা খুব চেঁচাইনছে। তু চল কেনে, আমাদের সাথে। মাকে লিয়ে হাসপাতালটো যাবি…তু না থাকলে…..”
শেষের কথাগুলো আর কানে পৌঁছলো না হাবুলের। বুকের ভেতরটা মোচড় দিচ্ছে, চোখদুটো জলে ভরে যাচ্ছে। একটা অব্যক্ত কষ্টে ছাড়খার হয়ে যাচ্ছে ভেতরটা, যার কারণটা শুধু হাবুলই জানে।
ছোট দিদিমণি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, “কাঁদিস না হাবুল। কিছু হবে না। এই তো একটুখানি কষ্ট হবে, তারপর দেখবি ছোট্ট একটা ভাই এসেছে…কাঁদে না বাবা…”
ক্ষেন্তিমাসি দিদিমণিকে বিদায় জানিয়ে হাবুলের হাত ধরে এগিয়ে গেল।
হাবুলের দু’চোখ ছাপিয়ে নোনা জলের স্রোত বয়ে চলেছে। স্কুলের গেট পেরোনোর আগে একবার পিছন ফিরে তাকাল ও। লতাদিদি তখন কড়াই থেকে নামিয়ে আনছে সফেদ, মসৃন, সেদ্ধ ডিমগুলোকে!
নাকি হাবুলের অপূর্ণ সাধটাকে?

কমেন্টস
darun darun ..ki6u bolar vasha khuje pelam na …