কলকাতায় অ্যাংলো ইন্ডিয়ান আস্তানাগুলোর যখন অল্প বিস্তর ডিসেন্ট্রালাইজেশন হল, মানে কিছু সংখ্যক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বো ব্যারাক, পার্ক স্ট্রিট, বা ক্রিক রো ছেড়ে ছড়িয়ে পড়ল কলকাতার অন্যত্র, তখন আমাদের নিতান্ত আটপৌরে গলিটাতেও এমনই একটি পরিবারের পদচিহ্ন পড়ল।
নারায়ণী কাকিমার বাড়ির একতলার দুটি ঘর তারা ভাড়া নিল। তখন টিভিতে সাকুল্যে দুটি চ্যানেল, সোশ্যাল মিডিয়াও নেই, বেশিরভাগ লোকের দৈনন্দিন জীবন ধারাও একই রকম- ‘টাইম কলের’ লাইন, কেরোসিন তেলের লাইন, রেশনের লাইন – এই নিয়েই একঘেয়ে জীবন। তাই পাড়ার এই অ্যাংলো পরিবারের আগমন একটা বেশ ব্যাপার এবং খবর হয়ে উঠল, বিকালে কাকিমাদের ছাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে, তাদের ছেলে মানুষ করা আর বরের সেবা করা জীবনে, একটু বৈচিত্র আনল।
ইংরেজরা চলে গেলেও আমরা বরাবর একটু সাদা চামড়া হ্যাংলা, তা পুরো সাহেবের জায়গায় এই হাফ সাহেবদের প্রতিও পাড়ার বেশিরভাগ লোকের যথেষ্ট আদিখ্যেতা ছিল। শুরু থেকেই পাড়াতে লোকেরা তাদেরকে মনে মনে একটু উচ্চ স্থানে বসিয়েছিল।
টেপির মা যখন ওই বাড়িতে কাজ পেল, তখন পাড়ার আর সকল ‘কাজের লোক’দের মধ্যে তার আলাদা কদর, আর অন্য যে সকল বাড়িতে টেপিরমা কাজ করে সেই বাড়িতেও তার হঠাৎ করে মূল্য বেড়ে গেল। কেউ এখন আর টেপিরমাকে চটাতে চায় না। যাতে ওই অ্যাংলো বাড়ির খবরটবর পুরো পাওয়া যায়… টেপিরমাও বেশ গর্বের সঙ্গে সব বলে। এমনকি, কিভাবে মাঝেমধ্যে পিটার অ্যানিকে টেপিরমা’র সামনেই চুমু খায় সেটাও বেশ বড়াই করেই বলে। যা শুনে কাকিমারা সামনাসামনি ছ্যাঃ ছ্যাঃ করলেও, মনে মনে নিজের বরটিকে মিনমিনে ম্যান্তামারা বলেই দুষতো।
এদের ছেলে জনি যেদিন চন্দনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করল, চন্দনের গর্ব আর ধরে না। পরের দিন স্কুলের ভ্যানে উঠেই চন্দন সব্বাইকে বলে বসল – “জানিস আমার এক বন্ধু আছে, তার নাম জনি, সে হ্যাংলো।”
পাড়াতে যে কাকুরা দিব্যি লুঙ্গি-শার্ট না হয় পাজামা-শার্টে বাজার যেত, পিটারকে দেখে তারাই হঠাৎ হাফ প্যান্ট আর টিশার্ট পরে, এখনকার ভাষায় যাকে বলে ‘cool dude’ হয়ে, বাজার যাওয়া আরাম্ভ করল। কাকিমারাও অ্যানিকে দেখত ঠিকই কিন্ত আটপৌরে পাড়া তো, লজ্জা কাটিয়ে স্কার্ট আর শার্ট পরার সাহস আর করেনি।
পাড়ায় যেখানে বেশিরভাগই রাজ্য, বা কেন্দ্র সরকারের গ্রুপ সি বা ডি কর্মচারী, সেখানে একমাত্র পালকাকু একটি বেসরকারি বিদেশী ফার্মে চাকরি করে। সে মাঝেমধ্যে ট্যাক্সি করে অফিস যায়। যেখানে বেশিরভাগ লোক না গোঁজা হাফ শার্ট, প্যান্ট আর চটিতে অফিস রওনা হয় সেখানে এই পালকাকু একদম কেতা দুরস্ত ইস্তিরি করা ফুল শার্ট প্যান্টে গোঁজা, পায়ে জুতো, এক্কেবারে ফিট বাবু। পালকাকু সবার সঙ্গে মিশলেও ‘আমি আলাদা’ এরকম একটা হাব-ভাব নিয়েই থাকত।
তো পিটারকে পেয়ে পালকাকু বেশ খুশি। যাক কাউকে তো সেম লেভেলের পাওয়া গেল। তো যখনই পালকাকু পিটারকে দেখত রাস্তায়, ব্যস অমনি পাকড়াও করে ইংরেজিতে কথোপকথন চালু করে দিত। তার যতটা না পিটার-এর সাথে কথা বলার আগ্রহে তার চেয়ে অনেক বেশি অন্য লোকদের জানানোর জন্য যে সে কতটা ইংরেজিতে পটু। পিটার কিন্ত যথা সম্ভব উত্তর বাংলায় দিত। বাংলায় উত্তর পেয়েও পালকাকু ছাড়ত না, ইংরেজিতেই কথা চালিয়ে যেত।
ধীর ধীরে পিটারদের নিয়ে আলোচনা কম হল, কাকিমাদের ছাদের আলোচনায় আবার আজ কী রান্না হল, সেই বিষয়বস্তু ফিরে এল।
তবে কিছু পরিবর্তন রয়েই গেল – কাকুরা ওই টিশার্ট আর হাফ প্যান্টেই বাজার যায়।
এরই মধ্যে একদিন পালকাকুকে আবার পাজামা-শার্টে বাজার যেতে দেখা যেতে লাগল এবং আশ্চর্য পালকাকু আর পিটারকে পাকড়াও করে না এবং একটু যেন মনমরাও।
এই পরিবর্তন লোকের চোখ এড়ায়নি। একদিন সান্ধ্য আড্ডায় সাহস করে বোসকাকু জিজ্ঞাসা করেই ফেলল, উত্তরে যা শুনল তা সবার কাছেই অপ্রত্যাশিত। হাসবে না কাঁদবে সেটাই ভেবে উঠতে পারছে না।
পালকাকুর সদ্য প্রমোশন হওয়াতে অফিসের লোকদের খাওয়াতে পার্কস্ট্রিটের একটি নামি রেস্তোরাঁতে নিয়ে গিয়েছিল দু’দিন আগে। আর যে ওয়েটার সাদা শার্ট আর কালো প্যান্টেখানা পরে সার্ভ করতে এসেছিল, সে আর কেউ না, সে পিটার।
সেই সময় কেউ কাউকে চেনা না দিলেও, সেদিন পালকাকুর হাফ-সাহেব প্রীতির একটা রিয়ালিটি চেক হয়েছিল।
আর একটা বিষয় পালকাকুকে একটু দ্বিধায় ফেলেছে। অফিস কলিগদের সামনে কেতা দেখিয়ে তিনশো টাকা টিপস পিটারকে দিয়েছিল। ভেবেছিল, হয় পিটার নেবে না বা পরে ফেরত দিয়ে দেবে। দু’দিন গত। মাসের শেষ চলছে, পকেট টান, পিটারেরর থেকে টাকাটা ফেরত চাইবে কিনা এখন সেটাই পালকাকুকে ভাবিয়ে চলেছে।
পিটারদের আগমন যেমন দাবানলের মতো ছড়িয়েছিল, পিটার-এর পেশাও একই গতিতে সবাই জেনেছে। আর পিটার তাই এখন আর পাঁচজনের মতো স্বাভাবিক একজন। পাড়ার সবাই এখন নিঃসঙ্কোচেই পিটারের সাথে কথা বলে আর তা বাংলাতেই।
পিটারকেও সান্ধ্য আড্ডায় আজকাল প্রায়ই দেখা যায়। পিটাররা এখন আর পাঁচজনের মতোই পাড়ার সাধারণ নাগরিক।
ইলাসট্রেশানঃ স্মৃতীশ মণ্ডল

কমেন্টস
একটি অসাধারণ লেখা পড়লাম। জিয়ানস্টাল হলো। গল্পকুটির কে ধন্যবাদ এই লেখাটি প্রকাশের জন্য।