লেখক – সব্যসাচী
(১)
-“বলছি তুই সিওর জানিস, এই পথে ফেরে ? “
-“হ্যাঁ দু’সপ্তাহ ধরে নজর রাখছি, আজ একটা এসপার না’হয় ওসপার করে ফেলবো।“
নির্জন সিয়ারাম সরণী তে দুই ছায়ামূর্তি অপেক্ষা করে অন্ধকারের আড়ালে। অনুপ আর রূপম। দু’জন অনেক দিনের বন্ধু। ভালোমন্দ সবে সঙ্গে থাকে। বেশ সুপুরুষ চেহারা। বিশেষ করে রূপম কে দেখে মনে হয় গায়ে ভয়ানক জোর। অনুপের সে তুলনায় কম।
-“আসছে বোধ হয়।“ ফিসফিসিয়ে ওঠে অনুপ। রূপম তাকায়।
-“হ্যাঁ আসছে। যা বলেছি মনে আছে তো ? সেই মত কাজ।“
দুজনে ধীর পায়ে এগোয় সামনে আসা মেয়েটির দিকে।
অপমানটা বড্ড গায়ে লেগেছে বোধিসত্ত্বের। তৃণা সকলের সামনে এইভাবে না বললেও পারতো। আসলে তৃণা ওকে কখনো ভালোবাসেনি। অন্য একজনের সাথে সিনেমা দেখতে গেছে কলেজ কামাই করে। সেটা নিয়ে কিছু মনে হয়নি বোধির। এগুলো সে স্বাভাবিক ভাবেই নেয়। সে কেবল বলেছিল, “আমাকে বলে যেতে পারতি। আমি কি মানা করতাম।“
-“আমি কি তোর পোষা নাকি? যে তোকে বলে সব করতে হবে। নিজেকে দেখেছিস ? তোর লেভেল আর আমার লেভেলের মধ্যে অনেক ফারাক। কি হিসেবে আমার পেছনে ঘুরিস?” চোখে জল এসে গেছিল প্রায় বোধির।
আজ প্র্যাকটিস করতেও মন চাইলো না। একলা গিয়ে রেললাইনে বসেছিল । পা চালায় বোধি বাড়ির দিকে। সিয়ারাম গলিটা পেরিয়ে পড়লে আর খানিকটা। মা ফোন করছে বারবার। সামনের প্রাচীরটা ঘুরে আসতে হবে গলিটায় যেতে গেলে।
“বাঁচাআআও” চিল চিৎকার করে জিনিয়া। গালে থাপ্পড় কষিয়ে দেয় রূপম রেগে।
-“অনুপ পা’টা চেপে ধর। দেখছি আজ এ শালীকে কে বাঁচায়। বড্ড রূপের গরম এ মাগীর। রূপম চক্রবর্তীর গালে হাত? এমন অবস্থা করবো, কোথাও মুখ দেখাতে সাহস পাবে না।“
(২)
চিৎকার টা কানে পৌঁছায় বোধির। বুঝতে পারে প্রাচীরের ওপাশের নির্জন সিয়ারাম সরনী থেকে আসছে আওয়াজটা। পাতলা চেহারা বোধির। অনায়াসে প্রাচীর পেরিয়ে পড়ে তীব্র ক্ষিপ্রতায়। ওপাশে নামার য়াওয়ায়াজে ফিরে তাকায় অনুপ। রুপম হাত চেপে আছে জিনিয়ার। “বস তুমি চালিয়ে যাও, আমি এ শালা কে সামলে নিচ্ছি।“ জিনিয়ার পা ছেড়ে অনুপ এগোয় বোধির দিকে। পিঠের ব্যাগটা রাস্তার পাশে ফেলে দেয় বোধি। চোখে শান্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকায় অনুপের দিকে।
বোধির মুখ লক্ষ্য করে ডানহাতে ঘুষিটা ছোঁড়ে অনুপ। দক্ষতার সাথে ঘুষিটা আটকায় বোধি। অনুপের ডান হাতের মাংসপেশী তে যেন আগুন লেগে যায়। যন্ত্রণার কঁকিয়ে ওঠে সে। বামহাতে পরের ঘুষিটা চালায় সে। এক’পা পিছিয়ে আসে বোধি ঘুষিটা এড়াবার জন্যে। বাম পায়ে অনুপের পেটে লাথি মারে। সেখানেই লুটিয়ে পড়ে অনুপ।
“অনুপ ওঠ” বলে চিৎকার করে রূপম। বোধি জানে অনুপ আর এখন উঠবে না। জিনিয়া কে ছেড়ে রূপম এগোয় বোধির দিকে, গালাগালি করতে করতে। ঘুষি মারে বোধির মুখ লক্ষ্য করে। এড়িয়ে যায় বোধি ঘুষিটা। রূপমের ডানদিকের পাঁজরে একটা ঘুষি মারে পাল্টা প্রতিবর্ত ক্রিয়াতে। রূপম রেগুলার জিম করে। অতবড় চেহারার রূপম পাঁজর ধরে বসে পড়ে। পাঁজর ভাঙার আওয়াজটা তার নিজের কানেও আসে। রাগে যন্ত্রণা চেপে পকেট থেকে ছুরি বার করে রূপম। বোধির পেট লক্ষ্য করে চালায় ছুরিটা। ক্ষিপ্রতার সাথে এড়িয়ে যায় বোধি। হাতটা ধরে ফেলে রূপমের। মাথার উপর তুলে আছাড় মারে রূপম কে অনায়াসে। পিচরাস্তায় পড়া রূপমের ছুরিসহ হাত টাকে মোড়ে উল্টোদিকে। ছুরি খসে পড়ে হাত থেকে। কাঁধ ডিসলোকেট হবার শব্দে জিনিয়া পর্যন্ত চমকে ওঠে। বোধি জানে রূপম আর এখন উঠবে না। ডক্টর ছাড়া আর কেউ এদের দুজনকে জাগাতে পারবে না। সে জিনিয়ার দিকে এগোয়। মেয়েটা ভয়ে কুঁকড়ে গেছে একদম।
(৩)
“আপনি কৃষ্ণচন্দ্র কলেজে পড়েন না? “ প্রশ্ন করে বোধি। “দেখেছি আপনাকে, ফার্স্ট ইয়ার তো?”
“হ্যাঁ” মাথা ঝুঁকিয়ে জবাব দেয় জিনিয়া। ভয় গ্রাস করেছে তাকে।
“কোথায় যাচ্ছিলেন এখান দিয়ে?” জিগ্যেস করে বোধি।
“পড়ে ফিরছিলাম, ওপাশের গলিটার ওপারে পেয়িং গেস্ট থাকি।“ উত্তর দেয় জিনিয়া।
“থানায় যাবো , চলো আমার সাথে।“ জিনিয়া এগোয়। বোধি পেছনে। ফোনে কারোর সাথে কথা বলছে মেয়েটা। আনমনে নিজের লেভেলের ফারাকটা হিসেব করতে করতে হাঁটতে থাকে বোধি নির্লিপ্ত ভাবে।
থানার অফিসার বেশ খাতির করে জিনিয়া কে। জিনিয়ার এক মামা নাকি পুলিশের বড় অফিসার, কথা শুনে বোঝে বোধি। থানার অফিসার বেশ বাহবা দেয় বোধিকে। থানার কাজ শেষ করে থানা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে থাকে দুজনে।
“আমাকে একটু পৌঁছে দেবে?” প্রশ্ন করে জিনিয়া। বোধি নীরবে মাথা নাড়ে। অটো ধরে দুজনে। ছেলেটা এত নির্বিকার কিভাবে। এত বড় ঘটনা ঘটে গেল। কিছুই বলছে না তবু এ ব্যাপারে। ভাবনা গ্রাস করে জিনিয়া কে।
“আচ্ছা এরা আপনার সাথে এমন ব্যবহার করছিল কেন? মানে আগে কিছু ঝামেলা হয়েছিল নাকি” নীরবতা ভাঙে বোধি।
“ঐ রূপম ছেলেটা প্রপোজ করেছিল আমায়। ফলো করতো আমাকে। আমি না বলায় জোর জবরদস্তি। টেনে থাপ্পড় দিয়েছিলাম একটা রাস্তার উপরেই। পরে জানলাম এরা নামকরা এইসব কাজে। এরা কি ভাবে ? মেয়েদের পেছনে ঘুরলেই, জোর জবরদস্তি করলেই মেয়েরে ভালোবাসতে রাজি হয়ে যাবে? তবে এতটা বাড়াবাড়ি করবে ভাবিনি। ভাগ্যিস তুমি এসে পড়েছিলে। কিভাবে যে ধন্যবাদ দেবো। বাই দ্য ওয়ে আমার নাম জিনিয়া। তুমি?”
“আমি বোধিসত্ত্ব।“
“তুমি ওইভাবে ওদের সামলালে কি করে? বাপরে, হাতে ছুরি ছিল আবার। দুজনে তো মারাত্মক ইনজিওর্ড। তুমি কি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ো? দেখিনি তো তোমায়? কোন স্ট্রিম? “ একসঙ্গে অনেকটা বলে থামলো জিনিয়া।
“না, আমি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি না…”
“ওহ্ আচ্ছা আমি এসে গেছি, এই আমার বাসা।“ অটো থেকে নামে জিনিয়া।
“আমি দিয়ে দেব। চলো ভাই।“ অটোওয়ালা কে বলে বোধি।
(৪)
“তোর পুরোনো বয়ফ্রেন্ড এর কীর্তি শুনেছিস তৃণা ?” উষা হাল্কা স্বরে প্রশ্ন করে তৃণা কে।
“বোধি আবার কবে আমার বয়ফ্রেন্ড ছিল রে? সার্ভেন্ট বল সার্ভেন্ট।“ হেসে গড়িয়ে পড়ে তৃণা।
“তা কি করেছে শুনি?” উষার দিকে কৌতূহলহীন চোখে তাকায় তৃণা।
“জিনিয়াকে চিনিস ?” উষা বলে।
“ঐ ফার্স্ট ইয়ারের সুন্দরী মেয়েটা?”
“বাব্বাহ্, তুই ও ওকে সুন্দরী বলছিস। মানে মেয়েটা সত্যিই সুন্দরী।“
“হ্যাঁ কেবল গায়ের রঙটা কালো! তা হয়েছেটা কি শুনি।“
“ওর উপর দুজন বদমাশ রেপ অ্যাটেম্পট করেছিল, বোধি বাঁচিয়েছে ওকে। কি করে করলো বলতো।“
“বোধি বাঁচিয়েছে ? ও ক্যারাটে ফ্যারাটে করে জানতাম। কিন্তু মেয়েকে বাঁচাতে পারে জানতাম না তো! “
“হ্যাঁ রে । চল ক্যান্টিনে যাই। এই নিয়ে বাজার গরম আজ।“ উষা মৃদু হেসে বলে। একটা ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হেসে হাঁটা দেয় তৃণা।
“ছেলেটিকে কোথায় পাওয়া যায় বলতো?” জিনিয়া প্রশ্ন করে রিমি কে।
“কি ব্যাপার, উদ্ধার কর্তার প্রেমে পড়েছিস নাকি জিনিয়া?”
“না না ছেলেটাকে ঠিক করে ধন্যবাদ পর্যন্ত দেওয়া হলো না। তবে আমাদের কলেজে পড়ে সিওর।“
“আচ্ছা তা কিরকম অ্যাকশন করলো আর একবার শুনি!”
“দূর! এইসব অ্যাকশন ট্যাকশন ভালো না। কিরকম সব গুণ্ডা টাইপ। তবে নেহাত আমাকে বাঁচিয়েছে তাই ধন্যবাদ বলে ট্রিট দিতে চাইছি।“
“দেখা যাক, জিনিয়ারানী তোমার হিরো কে কোথায় পাই। চল্ ক্যান্টিনে যাই। খোঁজ পেলে ওখানে পাওয়া যাবে।“
দুজনে হাঁটা দেয় ক্যান্টিনের দিকে।
রেলপাতের উপর দিয়ে হাঁটতে বড় ভালো লাগে বোধির। সকালে মা বকছিল খুব। কলেজ গেলনা বলে। দুপুরে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। আসলে তৃণার অপমান টা বড্ড গায়ে বিঁধেছে তার। না আজ বিকেলে প্র্যাকটিসে যেতে হবে। বিকেলে জুডো প্র্যাকটিস করলে মন ঠিক হয়ে যাবে। আজ সকালে ক্যারাটে প্র্যাকটিস করেছে খানিক। মার্শাল আর্ট এই সে শান্তি খুঁজে পায় বেশি। তৃণা এসব পছন্দ করেনা। বলে “কি হবে এসব গুন্ডামি করে। বেকার কাজ যত!” রেলপাত থেকে নেমে হাঁটা দেয় বোধি। মাথাটা ভারী হয়ে আসছে। এখন গিয়ে প্র্যাকটিস করবে। বড্ড ইচ্ছে করছে।
(৫)
এই নিয়ে ৭ দিন কলেজ যায়নি বোধি। দিনরাত খালি ক্যারাটে, জুডো এইসব। তৃণা কে ফোন করতে গিয়ে থেমে গেছে। মেসেজ পাঠাতে গিয়ে পাঠায় নি। ঘুরে বেড়িয়েছে এদিক ওদিক। কাল কলেজ যেতেই হবে। বন্ধুরা সব ফোন করে জালাচ্ছে। কামাই তো করে না বোধি। এ বছর ফাইনাল ইয়ার তার। ভালো নাম্বার না হলে মাস্টার্স করা যাবে না। বাবার খুব ইচ্ছে যে বোধি মাস্টার্স করে ইংলিশ এ। সায়ন ফোন করে বলছিল, সেদিনের সেই মেয়েটা নাকি তাকে খুঁজছিল। ক্যান্টিনে সায়ন কে নাম্বার চেয়েছে। সায়ন দিয়েও দিয়েছে। বোধি বিরক্ত হল সায়নের উপরে। সায়ন খিক খিক করে হেসে উড়িয়ে দিল ব্যাপারটা কে।
“শুনছো, তোমাকে খুঁজছিলাম।“ মেয়েলী গলা শুনে ফিরে তাকায় বোধি। জিনিয়া আসছে জোরে হেঁটে।
“ফোন ন্মবার ছিল তোমার। কিন্তু বিরক্ত হবে ভেবে ফোন করিনি। অ্যাদ্দিন কলেজেও আসোনি। তুমি তো থার্ড ইয়ার, সায়নদা বললো।“ থামে জিনিয়া।
“কিছু বলবেন?” নির্লিপ্ত স্বরে প্রশ্ন করে বোধি।
“না, আসলে তোমাকে ঠিক করে যে ধন্যবাদ জানানো হয় নি তাই। ক্যান্টিনে গিয়ে কিছু খাওয়া যাক। চা কফি কিছু একটা।“
“আমি তো কিছু খাইনা, তবে সঙ্গে যাওয়া যায়। চলুন।“
ক্যান্টিনে আসে দুজনে।
“আপনি না বলে তুমি বললে ভালো হয়। আচ্ছা এইভাবে ওদের মারলে কি করে। তুমি কি প্রায় মারপিট করো নাকি?” জিনিয়ার চোখে কৌতূহল।
“না। মার্শাল আর্ট প্যাশন আমার তাই…”
“আচ্ছা দারুণ ব্যাপার। বলছি চাউমিন বলি। খাবে তো?”
ঘাড় নাড়ে বোধি।
ক্যান্টিনের বিশুদা। দু প্লেট চাউমিন দিয়ে যায়। চুপচাপ খেতে থাকে বোধি।
“কিরে কিরকম তোর হিরো ?” রিমি ঠোঁটে হাসি নিয়ে প্রশ্ন করে জিনিয়াকে।
“বাপরে, এরকম বরফ! বাঁচাও। এরসঙ্গে কোনো মেয়ে টিকবে না।“ হেসে গড়িয়ে পড়ে দুজনে ।
(৬)
“বাব্বাহ্, অনেক দূর এগিয়েছিস তো রে।“ রিমির গলায় মজার সুর। জিনিয়ার ফোনটা হাতে নিয়ে হোয়াট্সঅ্যাপ চ্যাট টা পড়ছিল সে।
“দূর উদাস থাকে সারাদিন। কথা বলতে চায়না । কেন উদাস থাকে কে জানে।“
“প্রাক্তনের চিন্তা করে হয়তো। যাইহোক শেষ পর্যন্ত গুন্ডার সাথে কথা বললি।“
“নারে, ও সেরকম নয়। একটু বোঝা মুসকিল। কিন্তু মানুষ খারাপ না।“
“বাব্বাহ্ বুঝে গেছিস তো। তা এবার ডেটিং এ যা একদিন।“
“দাঁড়া রাজি করিয়েছি। নদীর পাড়ে গিয়ে বসবো একদিন।“
“নদীর পাড়ে?”
“হ্যাঁ বাবুর নদী খুব ভালো লাগে।“
“যা যা, আর দেরি করিস না সোনা।“
“আচ্ছা, তাহলে আসিরে এখন।“ জিনিয়া ঠোঁট চেপে হেসে হাঁটা দেয়।
“তৃণা শুনেছিস, ঐ জিনিয়া মেয়েটা নাকি বোধির প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।“ উষা হাসতে হাসতে বলে।
“মেয়েটা কি ক্ষ্যাপা ? বোধির মত ছেলের জন্যে কেউ পাগল হয় নাকি? মেয়েটার যদি তিল পরিমান বুদ্ধি থাকতো তবে এ ভুল করতো না।“
“যাই বল, মেয়েটার গায়ের রঙ তোর মতো ফর্সা না হতে পারে, কিন্তু মুখটা বড় মিষ্টি। আর বেশ বুদ্ধিমতী বলে শুনেছি।“
“তুই থাম তো…” উষার উপর রেগে যায় তৃণা। উষা মুখ চেপে হাসে। তৃণা রেগে কলেজের গেট এর দিকে হনহন করে হাঁটা দেয়।
নদী দেখলে বেশ শান্ত লাগে নিজেকে। প্রায় আসতো আগে তৃণার সাথে এখানে। পরে একা একা। আজ আবার এসেছে তবে একা না। না তৃণা ও না। জিনিয়া জোর করে ডেকে এনেছে তাকে। অবশ্য মনে মনে তার ইচ্ছে ছিল আসবার। জিনিয়া বলেছে দরকার আছে কিছু। বোধির হেল্প চাই। চুপচাপ বসে পড়ে বোধি ভাঙা ঘাটটায়। এই ঘাট টা বেশ নির্জন তাই প্রিয় তার। দুজন ডিঙি নৌকা নিয়ে ভাসছে মাঝ নদী তে। সত্যি নদী কেমন করে সবাই কে আপন করে নেয়।
“আমি যদি রাস্তা না খুঁজে পেতাম। রাস্তার উপর দাঁড়াতে হয় তো।“ জিনিয়ার কথায় চমক ভাঙে বোধির।
“ও, আমি ভাবলাম তুমি চিনে আসবে ঠিক।“
“ক’মাস তো হয়েছে সবে। কি করে চিনবো সব? সব তো চিনি না। একজন কে জিগ্যেস করতে দেখিয়ে দিল।“
“আচ্ছা, আমি আসলে বুঝিনি।“
“হুম, তুমি তো এখানে প্রায় আসো?”
“হ্যাঁ, তুমি কি করে জানলে?”
“তুমি ই তো বলেছিলে। ভুলে গেছ দেখছি।“
“তা হতে পারে। খুব ভুলি আমি। কি বলবে বলেছিলে, শুনি এবার।“
(৭)
জিনিয়া যা বললো তার মানে এই দাঁড়ায়, বোধিকে তার ভালো লেগে গেছে। সে এই সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে এগোতে চায়। বোধির মনের ইচ্ছে জানতে চায় সে। সব শুনে বোধি নির্বাক হয়ে শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে নদীর বুকের দিকে। আর জিনিয়া তাকিয়ে থাকে বোধির দিকে। দু’জনে চুপচাপ কেবল নদী কথা বলে। বোধি চুপচাপ ভাবতে থাকে যে, মেয়েটা কি দেখেছে তার মধ্যে এমন যে, বোধি কে তার ভালো লেগে গেছে ? আবছা ভাবনারা অস্থির করে বোধিকে। সে ভাবনার খানিক জুড়ে তৃণার বিচরণ দেখে বোধি।
বইটা খোলা কেবল। পড়াশোনা কিছুই হচ্ছে না জিনিয়ার। এমনি বরাবর ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে এসেছে সে। স্কুল জীবনে একটা ছেলেকে বড্ড ভালো লেগে গেছিলো তার। তখন ইলেভেন এ পড়ে। পাশের বয়েজ স্কুলের ছাত্র। সারাদিন চিন্তায় মশগুল। ব্যস্, হাফ ইয়ারলি তে রেজাল্ট খারাপ। বাবার বকুনি জুটলো। মনে সাহস এনে বলতে গেল ছেলেটিকে। চরম অপমানিত হলো সে। ছেলেটি বেশ হ্যান্ডসাম আর ফর্সা ছিল। জিনিয়ার গায়ের রঙ খুব ফর্সা না। অগত্যা অপমানিত এবং প্রত্যাখিত। কিন্তু পাড়ার সবাই বা পরিচিত সবাই বলে জিনিয়া খুব লাবণ্যময়ী। স্কুল জীবনে আরো ছেলের কাছে প্রস্তাব পেয়েছে জিনিয়া। কিন্তু বুদ্ধিমতী জিনিয়া সহাস্যে সেগুলো কে এড়িয়েছে। এই বোধির কথা ভাবলে যে কি হয় তার। ছেলেটা হ্যাঁ না কিছুই বলছে না। বলছে ভাববার সময় চাই। আনমনে নিজের নেলপলিশ দিয়ে নিজের নখে ডিজাইন আঁকতে থাকে জিনিয়া।
প্র্যাকটিস সেরে এসে চুপচাপ শুয়েছিল বোধি। মোবাইলটা পাশে পড়ে। ইনবক্স এ মেসেজ এর পর মেসেজ ঢুকছে। চেক করতে ইচ্ছে করছে না। হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে বোধির। চেনা নাম্বার।
“হ্যাঁ বলো…”
“কলেজে আসছিস না কেন?”
“এমনি।“
দেখ, তুই কলেজে আয়, সবাই ভাবছে তুই আমার জন্যে কলেজে আসছিস না।“
“না তৃণা সেরকম কিছু না।“
“কাল থেকে কলেজে আসবি, দ্বিতীয়বার যেন বলতে না হয়।“ মেজাজ দেখিয়ে ফোন কেটে দেয় তৃণা। তবে কি তৃণার মনে কোনো জায়গা আছে বোধির? সব কেমন গুলিয়ে যায় বোধির কাছে।
“কি চাইছিস তুই?” প্রশ্ন করে রিমি জিনিয়া কে।
“ও আমাকে ভালোবাসুক এটাই, আর কিছু না।“
“জোর করে চাস? ও হয়তো এখনোও তৃণা কে ভালোবাসে।“
“না জোর করে না, ওর মন চাইলে তবেই।“
“আর ও যদি না চায় তোকে, তবে ?”
“তবে আমার প্রেম আমার ই থাক। অপমানিত হতে চাই না।“
“চোখটা মোছ পাগলী…” রিমি জিনিয়ার দিকে রুমাল বাড়িয়ে দেয়। জিনিয়া কাঁধ ভেজায় রিমির। জিনিয়ার চোখে আজ নদী বাঁধ ভেঙেছে।
(৮)
“জানিস তুই এই থ্রো এর টেকনিক টা ভালো করে করতে পারিস, আর ওই টেকনিকটা পারিস না কেন ?” প্রিয়াংশু স্যার প্রশ্ন করে বোধিকে। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে ছিল বোধি। গত একমাস ধরে সে একটা জুডো টেকনিক কে সঠিক করতে পারছে না। টেকনিকটাকে খুব পছন্দ করে সে। তবুও। তার খুব ভালো লাগে থ্রো টা। অনেক বার চেষ্টা করছে। তবুও যেন বশ মানছে না। কিছুতেই ১০০% ঠিক হচ্ছে না।
“এই টেকনিক টা অনেক আগে থেকে করছি আর ঐ থ্রো টা ক’দিন আগে শিখেছি, তাই। কিন্তু এই টেকনিক টাও ভালো লাগে আমার।” জবাব দেয় বোধি।
“না কারণ এই থ্রো এর টেকনিকটাকে তুই ভালোবাসিস। আর ঐটা পছন্দ তোর কেবল। এখনো ভালোবেসে উঠতে পারিস নি। ভালোলাগা আর ভালোবাসা এক না। ভালোবাসা হতে গেলে টান চাই। যেটা কেবল এই টেকনিকটার প্রতি তোর আছে। ওটার প্রতি নেই এখনো অব্দি। জুডো ইজ লাইক লাইফ। জীবনে যেমন টানটা কিসের প্রতি আর ভালোবাসাটা কিসের প্রতি সেটা বোঝা জরুরী। তেমনি জুডোতেও কোন টেকনিক টা ভালোলাগা আর কোন টেকনিক টা ভালোবাসা সেটা বুঝতে হবে। আর আমি নিশ্চিত তুই সেটা পারবি। কেবল একটু মন দিয়ে ভাব। শুধু মনে রাখিস, জুডোতে সব টেকনিক জরুরী কিন্তু জীবনে সব মানুষ জরুরী না। তবে হ্যাঁ জুডো ফাইটিং এ যেমন ভাবে তোকে তোর ভালোবাসার টেকনিক টাই বাঁচাবে। তেমনি জীবনেও সে তোর পাশে থাকবে, যে তোকে ভালোবাসে। মার্শাল আর্ট ইজ সিমিলার টু লাইফ, বুঝলি বোধি? “
চুপ করে সব শোনে বোধি। তার স্থির চোখ দেখে বোঝা দায় সে জীবনের সাথে মার্শাল আর্ট কে মেলানোর চেষ্টা করছে।
“আজকাল জিনিয়ার সাথে বড্ড মাখামাখি করছিস। আমাকে বলিস নি তো।“ তৃণা প্রশ্ন করে বোধি কে। অনেক দিন বাদে কলেজে এসেছে বোধি আজ।
“না প্রয়োজন বোধ করিনি, আর তাছাড়া সব কথা তোকে বলতে যাবো কেন? আমি কি তোর পোষা নাকি?” শান্ত অথচ ধীর এবং দৃঢ় গলায় উত্তর দেয় বোধি।
“তুই এই ভাবে কথা বলছিস আমার সাথে ? তৃণার সাথে?”
“তোর কাছ থেকেই শেখা এই ভাবে কথা বলা। আর তাছাড়া আমি আমার লেভেল টা বুঝে গেছিরে তৃণা।“
তৃণা নিশ্চুপ হয়ে যায়। বোধি তার সাথে এই ভাবে কথা বলবে সে আন্দাজ তার ছিল না। ছেলেটাকে বড্ড বোকা আর আনস্মার্ট ভাবতো সে। বুঝলো মানুষ চিনতে ভুল করেছে সে। বোধি বেরিয়ে যায় ক্লাস রুম থেকে। ফাঁকা বেঞ্চের সাথে তৃণা তার অপমান কে ভাগ করে নেবার চেষ্টা করে।
(৯)
ফোন বন্ধ জিনিয়ার। সব জায়গায় খোঁজ নেয় বোধি। টিউশন, যেখানে থাকে সেখানে। সব জায়গায়। আজ মেয়েটার জন্মদিন। তাই হন্যে হয়ে খুঁজছে বোধি। হঠাৎ মাথায় চমক দিয়ে ওঠে একটা কথা। তাড়াতাড়ি পা চালায় বোধি নদীর ঘাটের দিকে।
চুপচাপ নদীর বুকের দিকে তাকিয়ে থাকে জিনিয়া। ভালো লাগছে না তার। তাই ফোন বন্ধ করে নদীর ঘাটে বসে আছে। বন্ধুরা সিওর খুঁজছে তাকে। পার্টি করবার কথা সন্ধ্যেতে। বোধির কথা ভেবে চোখে জল তার।
“ফোনটা অফ যে, ব্যাপার টা কি?” অস্থির ভাবে খানিক রাগত স্বরে জিগ্যেস করে বোধি।ফিরে তাকায় জিনিয়া।
“কাঁদছো কেন?” প্রশ্ন করে বোধি।
বোধির বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে জিনিয়া। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে, কথারা চুপ তখন। মাথায় চোখের জলের গরম স্পর্শে মুখ তোলে জিনিয়া। বোধিও কাঁদছে।
“দুজনেই যদি কাঁদবো, তবে সামলাবে কে?” ফোঁপাতে ফোঁপাতে জিগ্যেস করে জিনিয়া।
“তুমি আমাকে আর আমি তোমাকে সামলাবো।“
আবার বোধির বুকে মুখ লোকায় জিনিয়া। জন্মদিনের সেরা উপহারটা পেয়েছে সে আজ।
“তোমার খোলা চুলে ভালোবাসা মাখা, আঁচলে মমতা ভর্তি;
প্রেমঝর্ণায় মন ভেজাও, নদী হয়ে মিশে যাও আমার প্রাণে।
আমাতে শুরু তুমি আর তোমাতে শেষ আমি,
একথা আমরা জানি আর আমাদের অন্তর্যামী জানে।“
চোখ তুলে তাকায় জিনিয়া, “কার লেখা?“
“আমার…”
“ছুপা রুস্তম তুমি…” বলে কপট রাগে বোধির হৃদস্পন্দন শোনায় মন দেয় জিনিয়া। তখন শান্ত নদীতেও তীব্র স্রোত। ভালোবাসার স্রোত।

কমেন্টস
very nice story , love to read this thank you
প্রেম ঝর্ণার ইতিবৃত্ত ভালো লাগলো।