রিভিউ – বিষ্ণু শর্মা |
কবি পূর্ণেন্দু পত্রীর দুটো লাইন ছিল, ‘স্বপ্নকে দেয় সর্বশরীর, সমক্ষে সে ভাসে না/যে টেলিফোন আসার কথা, সচরাচর আসে না।’ এই টেলিফোন অনেকটা আমাদের অবচেতন মনের চাহিদাগুলোর মতো, যা আসবে না জেনেও ভাবতে ভালো লাগে। পাওয়ার একটা ইচ্ছেকে আঁকড়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেওয়া যায়। পরিচালক অতনু ঘোষের ছবি ‘রবিবার’ তেমনই কিছু দিক নিয়ে কথা বলে। জীবনের টানাপোড়েনকে সঙ্গে নিয়ে দুই ভিন্ন মেরুর মানুষের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার পুনরুদ্ধার করতেই তিনি সম্ভবত বেছে নিয়েছেন সপ্তাহের এই বিশেষ দিনটাকে।
অসীমাভ (প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়) এবং সায়নী (জয়া আহসান)-র ভেঙে যাওয়া দাম্পত্যের রেশ টেনে এগিয়ে চলে ছবির গল্প। রবিবার, এক ছুটির দিনে সায়নী তার পাড়ার দোকানে ব্রেকফার্স্ট করতে ঢোকে। সেখানে বহু বছর পর হঠাৎই সায়নীর দেখা হয় তার প্রাক্তন অসীমাভ-র সঙ্গে। যদিও এই দেখা হওয়াটা যে ‘হঠাৎ’ নয়, এর পিছনে অসীমাভ-র ভূমিকা যথেষ্টই, সে আভাসও পরিচালক দিয়েছেন। সায়নীর সঙ্গে ঘণ্টা কয়েক কাটানোর ইচ্ছেতেই তাকে নিজের বাড়ি নিয়ে যায় অসীমাভ। এর পর বেশ কিছু ঘটনার মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় তাদের জীবন, অতীতের টানাপোড়েন এবং বর্তমান পরিস্থিতিও।
একটা গোটা রবিবারকে নিয়েই এই ছবি। ‘অসীমাভ’র খামখেয়ালিপনা, শিল্পের প্রতি কদর, হতাশা অথচ নিজেকে ‘জালিয়াত’ বলে মানা চরিত্রটা কোথাও গিয়ে যেন আমাদেরই কারোও গল্প হয়ে দাঁড়ায়। সায়নীর বাস্তবিক যুক্তিখোঁজা মন সেই চরিত্রকে ঘৃণা করলেও অস্বীকার করতে পারে না। বার বার চলে গিয়েও ফিরে আসে অসীমাভ’র কাছে। কোনও এক অপরিণত ভালোবাসার সন্ধানে কিংবা নিজের বইয়ের জন্য অসীমাভ’র অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর তাগিদে। সেই সঙ্গে পুলিশের খাতায় নাম তুলে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অসীমাভকেও বাঁচার স্বপ্ন দেখায় সে। এই গল্প দর্শককে মনে করায়, আমরা সবাই কোথাও না কোথাও জালিয়াত, সুযোগসন্ধানী। নিজের ক্ষেত্রে সেই জালিয়াতি যদি কাজে আসে, ক্ষতি নেই তাতে।
সব মিলিয়ে ‘রবিবার’ একটি জার্নি। অতনু ঘোষ জার্নি তুলে ধরতেই ভালোবাসেন। ক্লাইম্যাক্স দেখতে যারা হলমুখো হন, তাদের জন্য এই ছবি নয়। পরিচালক ছবির যাত্রাপথ নিজের মতোই সাজিয়েছেন, তবু কোথাও গিয়ে মনে হয়েছে, কিছু কিছু ঘটনা বা চরিত্রের বিষয়ে আর একটু জানা গেলে মন্দ হত না। যেমন সুপারি কিলার লটকাই (মিঠুন চক্রবর্তী) কিংবা বাঁশি বাজানো বাচ্চাটি (শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়) হঠাৎ করেই যেন নিরুদ্দেশ হয়ে যায় ছবি থেকে। এছাড়া কোনও কোনও দৃশ্য কিছুটা কম দৈর্ঘ্যের হলেও হয়তো চলত।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে প্রধান চরিত্ররা প্রত্যেকেই নিজেদের সেরাটা দিয়েছেন। নিজেকে ছবির মতো ভেঙেছেন জয়া আহসান। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ও অসীমাভ’র চরিত্রে সপ্রতিভ। চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনাও গল্পের প্রতি ন্যায়বিচার করে। যেটার কথা না বললেই নয়, তা হল দেবজ্যোতি মিশ্র’র আবহসঙ্গীত। ছবির বহু দৃশ্য জমিয়ে দিয়েছে বেহালা ও বাঁশির পর্যাপ্ত ব্যবহার, যা দেখা গিয়েছিল পরিচালকের আগের ছবি ময়ূরাক্ষীর ক্ষেত্রেও।
সব মিলিয়ে বছর শেষে ‘রবিবার’ একটা বাড়তি পাওনা হতেই পারে। মেইন স্ট্রিম ছবি বাদ দিয়ে একটু অন্য রকম বাংলা ছবির সন্ধানে যারা বছরভর মুখিয়ে থাকেন, ‘রবিবার’ তাদের মিস না করার পরামর্শই রইল।
ছবি সৌজন্যঃ জয়া আহসান ফেসবুক পেজ
