আদিত্য গুপ্ত|

রাত বাড়লেই বদলে যায় শহরটা। পুরনো সময় যেন নড়েচড়ে উঠে শরীর থেকে অতীতের ধুলো ঝেড়ে এসে দাঁড়ায় সামনে। গত কয়েকটি এপিসোড ধরে আমরা সেই গল্পই করছি! আজও আমরা একটু ঘুরে বেড়াতে চাই, খুঁজে পেতে চাই এক অন্য কলকাতাকে। কান পেতে শুনুন কাদের মধ্যে যেন উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হচ্ছে! আচমকাই শোনা গেল গুলির শব্দ। রাতের শরীর ফুঁড়ে তপ্ত সিসার বুলেট ঠিকরে পড়ল রাস্তায়।

হ্যাঁ, এটা কলকাতা মিউজিয়াম তথা জাদুঘরের পাশের রাস্তা। যার নাম সদর স্ট্রিট। আজ থেকে দু’শো বছর আগে এখানেই ছিল স্পিক সাহেবের বাড়ি। এক রাতে স্পিক সাহেব এই বাড়ি থেকে বেরোতেই তাঁর সামনে এসে দাঁড়ান এক শিখ যুবক। কী এক আর্জি ছিল তাঁর। এক ‘নেটিভ’-এর আর্জিতে কর্ণপাত করেননি স্পিক সাহেব। ক্রমে যা হয় এসব ক্ষেত্রে… কথা কাটাকাটি, গায়ে হাত, মারামারির উপক্রম। তখনই জাদুঘরের নৈশ প্রহরীরা সেখানে উপস্থিত হয়। ট্রিগারে আঙুল টেনে দেয় তারা। ঝলসে ওঠে আগুন। লুটিয়ে পড়েন সেই যুবক।

আজও নাকি সেই রাস্তা থেকে বেরোতে পারেননি সেই অসহায় শিখ যুবক। কখনও জাদুঘর, কখন সদর স্ট্রিটের রাস্তায় গভীর রাতে দেখা মেলে তাঁর! সময়ের হিসেবে দুই শতাব্দী পেরিয়ে আসা পৃথিবী আবার জ্যান্ত হয়ে ওঠে। অবিকল সেই দৃশ্যগুলি যেন অভিনীত হতে থাকে।

যে কোনও ‘ভূত’-এর গল্পই আসলে ফিরে আসার গল্প। বা বলা ভালো, যেন এক সময়ের বলয়ের ভিতরে চক্কর কাটার গল্প।
কলকাতা জাদুঘর যখন, একটা গল্পেই তো ব্যাপারটা শেষ হতে পারে না। এবারে যে গল্পটা বলব সেটা জাদুঘরের পাশের রাস্তার নয়। এই গল্প খোদ জাদুঘরের ভিতরের। অনেক নৈশ প্রহরীর দাবি, রাতের বেলায় জাদুঘরের ছাদ থেকে নেমে আসে এক আগন্তুক! গায়ে কাপড় মুড়ি দেওয়া। কে সে?

সে নাকি এক শ্রমিক। কেউ বলে স্কাইলাইট পরিষ্কার করতে গিয়ে শোকেস চাপা পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয় তার। আবার কারও মতে দেওয়াল রং করতে গিয়ে উপর থেকে নীচে পড়ে গিয়েছিল সে। সে-ই শ্রমিকেরও বুঝি মুক্তি হয়নি জাদুঘরের চৌহদ্দি থেকে। তাই ফিরে ফিরে আসে এক অতৃপ্ত আত্মা।

ছোট থেকে বড়— সকলের কাছেই এক অপরিসীম রোমাঞ্চের অনুভূতি মমির ঘর। স্বাভাবিক ভাবেই জাদুঘরের ভূতের গল্পে মমিকে কি বাদ রাখা যায়? রাতের বেলায় সাদা চাদর মুড়ি দেওয়া আর এক মূর্তির কথা শোনা যায়। অনেকেই মনে করে সেই মূর্তি ওই মমির। মাঝে মাঝে রাতের বেলায় তাকে জাদুঘর থেকে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখা যায়।

আছে আরও গল্প। বলাই বাহুল্য সবই রাতের ঝুঁঝকো আঁধারকে ঘিরে। জাদুঘরে রাত্রিবেলা শোনা যায় কাদের নাচ-গানের শব্দ!

এমনই কত সব গল্পকথা। হ্যাঁ, গল্পই। আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে কে এসবে বিশ্বাসের সিলমোহর ছোঁয়াবে? কিন্তু সত্যি মানে কি কেবল সেটাই যা চোখে দেখার, কানে শোনার? এর বাইরেও থেকে যায় কত কিছু। মনের অন্দরে গোপন সেসব অনুভূতি রাতবিরেতে কত কথাই বলে যায়। যেমন বসন্তের হাওয়ায় মন হু হু করে ওঠা। তেমনই রাতের গভীরে সামান্যতর এক শব্দের খসে পড়া মাথার ভিতরে কত কী তৈরি করে ফেলে। সত্যি নয় জেনেও মন তাকে সত্যি ভাবতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
রাত গড়ায় শহরের বুকে।

(তথ্যসূত্র: অশরীরী আতঙ্ক পৃথিবীর রহস্যময় ঠিকানা, উপমন্যু রায়)