আদিত্য গুপ্ত|
পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন। জীবনানন্দ দাশের কবিতার পঙক্তি আজ এই নীল রঙের গ্রহের বুকে এক চরমতম সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। নোভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। বাড়ছে মৃত্যু। দেশজুড়ে সম্পূর্ণ লকডাউন। ঘরের কোণে বসে মানুষ এক থমথমে মন নিয়ে অপেক্ষায়, কবে কখন শেষ হবে এই দমচাপা আতঙ্কের প্রহর। আপাতত অপেক্ষা ও সাবধানতা ছাড়া উপায় নেই। ইতিহাস বলছে, মহামারী এসেছে যুগে যুগে বারবার। আমাদের এই কলামে আমরা ইতিহাসের দিকে তাকাই। এবারও তাই হোক। এক মহামারীর আবহে ছুঁয়ে আসা যাক সুদূর অতীতের ঝাঁপির ভিতরে রয়ে যাওয়া মহামারীর ইতিহাসকে।
কোনও না কোনও ছোঁয়াচে অসুখ থেকেই ঘটে মহামারী। সেই আদিম মানুষের সময় থেকেই ছোঁয়াচে অসুখের দৌরাত্ম্য। কিন্তু তখনও তো গড়ে ওঠেনি সমাজ। মানুষ তখনও অরণ্যচারী। জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে শিকার করেই ক্ষুণ্ণিবৃত্তি নির্বাহ করত তারা। সেই ‘অসভ্য’ মানুষ অহরহ মৃত্যুর ফাঁদে পা দিত। আর তার মধ্যে ছিল ছোঁয়াচে অসুখও। কিন্তু যেহেতু তখন মানুষ সামাজিক হয়ে ওঠেনি, তাই মহামারীর সম্ভাবনা তৈরি হয়নি।
১০,০০০ বছর আগে মানুষ কৃষিজীবী হয়। আর তখনই শুরু হয় একসঙ্গে থাকা। একত্রে বাস করা। ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ফ্লু, গুটি বসন্তের মতো অসুখের জন্ম সেই সময়েই। এই সামাজিক জনজীবনেই ছোঁয়াচে অসুখ মহামারীর রূপ ধরতে শুরু করে। ক্রমে মানুষ বাণিজ্য করতে বা সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পাড়ি জমিয়েছে অন্য ভূখণ্ডে। এইভাবে ছড়িয়ে গিয়েছে সংযোগ। আর তারই ফলপ্রসূ জন্ম নিয়েছে মহামারী।
ইতিহাসে সবচেয়ে পুরনো মহামারী হল ৪৩০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে এথেন্সে। এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে সেই সময়ে। ৪৩১ থেকে ৪০৫ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে সেই লড়াই চলে। প্রাচীন গ্রিসে ক্ষমতা বদলের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয় সেই সময়েই। আর সেই সঙ্গে শুরু হয় এক বিশ্রী অসুখ। জ্বর, প্রবল তৃষ্ণা, রক্তাক্ত গলা ও জিভ, লালচে হয়ে ওঠা ত্বক। ছোঁয়াচে এই অসুখ ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত।
লিবিয়া, ইথিওপিয়া ও ইজিপ্ট হয়ে ক্রমে এথেন্স থেকে সেই রোগ গিয়ে পড়ে স্পার্টাতেও। মৃত্যু হয় সেখানকার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের।
কী ছিল সেই অসুখ? অনুমান, পৃথিবীর ইতিহাসের সেই আদিমতম মহামারী আসলে টাইফয়েডেরই এক রূপ। এই অসুখ এথেন্সের মানুষদের এতই কাবু করে ফেলেছিল যে স্পার্টানদের কাছে তাদের পরাজয়ের অন্যতম ফ্যাক্টর হয়ে পড়ে তা।
এরপর ৫৪১ খ্রিস্টাব্দ। এল জাস্টিনিয়ান প্লেগ। জন্ম ইজিপ্টে। তারপর প্যালেস্তাইন ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। সেখান থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল চলে যায় তার দখলে। পরবর্তী দুই শতাব্দী জুড়ে চলে তার দাপট। সেই সময় বিশ্বের জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ মানুষ (সংখ্যাটা ৫ কোটিরও বেশি) মারা যান প্লেগে। ইঁদুরবাহিত এই অসুখে (যা ছড়িয়ে দেয় মাছিরা) লিম্ফ্যাটিক গ্রন্থি বড় হয়ে যায়।
ইতিহাসের আদি পর্ব থেকেই এভাবে মানুষকে তীব্র সংগ্রামের মুখে ফেলে দিয়েছে মহামারী। তার চেহারা যুগে যুগে আলাদা হলেও চরিত্রে তারা একই রকমের ভয়াবহ, একই রকমের নিষ্ঠুর হন্তারকের। কিন্তু প্রতিবারই মৃত্যুমিছিলের চরম বিষণ্ণতা সত্ত্বেও শরীরে, মনে নতুন শক্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ঘুরে দাঁড়িয়েছে মানুষ। এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে সভ্যতার জয়রথ। এবারই তাই হবে, শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য শত্রুকে নকআউট করবে মানুষ। এবিশ্বাসই আজ সভ্যতার পাথেয়। যাকে মান্যতা দেয় ইতিহাসই।
