আদিত্য গুপ্ত|
গত বছর ছিল মানুষের চাঁদে পাড়ি দেওয়ার পঞ্চাশ বছর পূর্তি। আজও মহাকাশপ্রেমীদের কাছে বিস্ময়ের জলছাপ বয়ে আনে সেই অভিযান। অথচ তার পরেও চাঁদের মাটিতে অভিযান করেছে মানুষ। কিন্তু ইতিহাস গড়ার মুহূর্তে আর্মস্ট্রং-অলড্রিনরা যে রোমাঞ্চ তৈরি করতে পেরেছিলেন তাকে স্পর্শ করতে পারা সম্ভব হয়নি। তবে কেবল চন্দ্রাভিযানই নয়, বিগত শতকের ছয়ের দশক জুড়ে তিলে তিলে গড়ে উঠেছিল মানুষের মহাকাশ-সাফল্যের এক চোখ ধাঁধানো গ্রাফ! সেই সময় মহাকাশযাত্রীদের কত রকম লড়াই-ই না লড়তে হয়েছে। আমরা এই লেখায় ফিরে দেখব তারই এক অংশ। মহাকাশ অভিযানের প্রথম যুগে মানুষ কী খাবার খেত? সে গল্প কম চমকপ্রদ নয়।
১৯৬১ সাল। ধনতান্ত্রিক আমেরিকা বনাম সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’ চলছে। এমতাবস্থায় মহাকাশ রেসে মার্কিনদের জোর ধাক্কা দিতে প্রথম উপগ্রহ ‘স্পুটনিক’ মহাকাশে পাঠিয়ে দিয়েছে রাশিয়া। তারপর ‘লাইকা’ নামের কুকুরও প্রথম প্রাণী হিসেবে মহাকাশে গিয়েছে। এবার পালা মানুষের। ‘ভোস্তক ১’ চেপে প্রথম মানুষ হিসেবে মহাকাশে পাড়ি দিলেন ইউরি গ্যাগারিন। ছোটবেলা থেকে জেনারেল নলেজের বইতে নামটা বহুবার পড়েছেন। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন তিনি মহাকাশযানে বসে কী খেয়েছিলেন?
গ্যাগারিন সাহেবের সঙ্গে ছিল তিনটে টুথপেস্টের টিউবের সাইজের টিউব। ওজন ১৬০ গ্রাম। তিনটি টিউবের দু’টিতে ছিল গলানো মাংস এবং অন্যটায় চকোলেট সস।
পরের বছর মহাকাশে পাঠানো হয় ‘ভোস্তক ২’। গেরম্যান টিটোভ নামের এক সোভিয়েত মহাকাশচারী ছিলেন সেই যানে। গেরম্যান সাহেবও একটি রেকর্ড করেন। বলুন তো, মহাকাশে প্রথম বমি কে করেছিলেন? হ্যাঁ, সেই কীর্তি গড়েছিলেন গেরম্যানই। আর তখনই প্রথম অনুভূত হল, মহাকাশ অভিযানে বেরোলে শরীরে সঠিক খাবার সঠিক পরিমাণে ঢোকানো দরকার। অন্যথায়, শরীর বিগড়োতে দেরি হবে না।
১৯৬৩ সালে ‘স্পেস সায়েন্স বোর্ড’-এর ‘দ্য ম্যান ইন স্পেস কমিটি’ প্রথম বার বলেছিল ‘ফর্মুলা ডায়েট’-এর কথা। নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়েছিল গোড়া থেকেই। সেই কারণেই একেবারে মিহি করে পেস্ট বানিয়ে খাওয়ার পরিকল্পনা হয়। কিন্তু দেখা গেল এতে ভয়ানক শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে নভোচরদের। তাঁরা মহাকাশ থেকে ফেরার পর দেখা যাচ্ছিল ওজন অনেক কমে গিয়েছে। রাশিয়া বা মার্কিন দুই দেশের মহাকাশচারীদের ক্ষেত্রেই এক ছবি।
আসলে মহাকাশে ভারহীন অবস্থায় থাকার ভিডিও দেখে মনে যতই পুলক জাগুক না কেন, বাস্তবে বিষয়টা বেশ কঠিন। আর তাই মহাকাশচারীদের সামান্য কাজ করতেও প্রচুর এনার্জির প্রয়োজন হয়। অনেক দিক খেয়াল রাখতে হয়। যেমন, নভোচরদের শরীরে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম প্রয়োজন হাড়ের ক্ষয় আটকাতে। এর জন্য সোডিয়াম বিশেষ প্রয়োজন। আর ক্যালরি তো দরকারই।
তারপর থেকেই তাই ক্যালরি হিসাব করে খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করা হয় মহাকাশ অভিযানের সময়। নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এমন খাবারের তালিকা, যাদের বলা হয় ‘স্পেস ফুড’। একেবারে সমতাযুক্ত পুষ্টিকর খাদ্য। কেবল পুষ্টিকর হলেই হবে না। ভারশূন্য অবস্থায় ঠিকমতো হজম যাতে হয় সেটাও দেখা হয়। সহজেই তৈরি করা যায় এই খাবার। আবার সহজে নষ্টও হয় না। পর্বতাভিযানের মতো এখানেও শুকনো খাবারের আলাদা চাহিদা রয়েছে।
জানেন কি, চাঁদের মাটিতে বসে কী খেয়েছিলেন নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন? তাঁরা খেয়েছিলেন হ্যাম স্যালাড স্যান্ডউইচ, বিশেষ পানীয় যা ‘রিহাইড্রেবল’ এবং শক্তিবর্ধক ফলের টুকরো। সবশুদ্ধ চারবার তাঁদের চাঁদের মাটিতে খাওয়া দাওয়া করতে হয়েছিল।
অ্যাপোলো মিশনের শুরু থেকেই নাসা খাবার নিয়ে নানা পরীক্ষা চালাচ্ছিল। যে খাবার তৈরি হয়েছিল তাকে দেখে আমাদের পৃথিবীর চেনা খাবারের মতো লাগে না। তবে নানা রকম খাবার নিয়েই পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছিল। টুনা স্যালাড থেকে শুরু করে নানা রকম। প্রতিটি খাদ্যবস্তুই শুকনো করে তৈরি করা এবং উত্তাপের সাহায্যে (থার্মো-স্টেবিলাইজড) ব্যাকটিরিয়া খতম করে তৈরি করা। পাউচে করে খাবার পরিবেশন করা হয়। চামচের সাহায্যে খেতে হত। ১৯৬৮ সালের ক্রিসমাস পালন করার সময় অ্যাপোলো ৮-এর যাত্রীরা খেয়েছিলেন থার্মো-স্টেবিলাইজড টার্কি, গ্রেভি ও ক্র্যানবেরি সস।
টিউবের খাদ্য খাওয়ার দিন গত। নাসার ওয়েবসাইটের হিসেব অনুযায়ী, ফল, বাদাম, মুরগি, পশুর মাংস, সি ফুড, ক্যান্ডি এবং আরও অনেক কিছুই এখন মহাশূন্যে খেতে পারেন মহাকাশচারীরা। তালিকা থেকে বোঝা যায়, দিনকাল সত্যিই বদলেছে।
তথ্যসূত্রঃ নাসা ওয়েবসাইট এবং উইকিপিডিয়া
ছবি সৌজন্যেঃ পিক্সাবে
