শুভজিৎ দে|
ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে সমৃদ্ধ কলকাতায় আজও নজর কাড়ে বেশ কিছু গির্জা। বড়দিনের আগে থেকেই এগুলি আলোকমালায় সেজে উদাসী শীতের মরসুমে আবারও শহরে উৎসবের মেজাজ ফিরিয়ে আনে। কলকাতায় বড়দিন উৎসব ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল সে কথা সঠিক ভাবে জানা না গেলেও, অনুমান করা হয় খ্রিস্টধর্মাবলম্বীরা এ দেশে আসার পরেই উপাসনার জন্য তৈরী হয়েছিল প্রার্থনাকক্ষ। তবে উপাসনার জন্যে প্রথম যে বাড়িটি তৈরী হয়েছিল তা কোনও গির্জা নয়, ছোট একটা উপাসনাগৃহ৷ এখনকার জিপিও-রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অঞ্চলে ছিল ইংরেজদের প্রথম কুঠি ও দুর্গ৷ তার মধ্যেই ছিল সেই উপাসনাগৃহ৷
তবে ইংরেজরা এ দেশে আসার অনেক আগেই খ্রিস্টধর্মাবলম্বী আর্মেনিয়ান ও পর্তুগিজরা বাংলায় এসেছিল। পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে ফিরিঙ্গি বণিকদের আনাগোনা শুরু হয় কলকাতায়। এর পরেই বিভিন্ন স্থাপত্যশৈলীর প্রভাবে তৈরী হতে থাকে কলকাতার গির্জাগুলি। প্রাচীন এই গির্জাগুলির প্রতিটির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে অজানা কাহিনি।
আর্মেনিয়ান চার্চ:
কলকাতার বড়বাজারের, আর্মেনিয়ান স্ট্রীটে এই চার্চটি অবস্থিত। ১৭৬৪ সালে নির্মিত আর্মেনিয়ান চার্চ হল কলকাতার সবচেয়ে প্রাচীনতম গির্জা। এই চার্চের ভিতরের দেয়ালগুলি মার্বেল দ্বারা সুসজ্জিত এবং গ্যালারির আচ্ছাদনে মূরাল ট্যাবলেট রয়েছে। যীশু খ্রীষ্ট ও তাঁর দ্বাদশ শিষ্যের উদ্দেশ্যে সেটির বেদিতে একটি ক্রূশ, খ্রীষ্টের উপদেশাবলী ও ১২-টি মোমবাতি পেশ করা হয়েছে। আর্মেনিয়ানরা, ব্রিটিশদেরও আগে ভারতে এসেছিল বলে দাবী করে। তারা ইউরোপীয় মহাদেশে খ্রীষ্টীয়করণেও অগ্রদূত ছিলেন বলে দাবী করা হয়। ১৬৮৮ সালের ২২-শে জুন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইউরোপে আর্মেনিয়ানদের সঙ্গে একটি সমঝোতার স্মারকলিপি বা সন্ধিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি অনুসারে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের যে কোনও জায়গায় গির্জা নির্মাণ করার অনুমিত দেয়, তবে সেখানে কমপক্ষে অন্তত ৪০-জন আর্মেনিয়ানদের বসবাস করতে হবে। ১৭৩৪ সালে, আগা মামেদ হাজার মালিয়ার দ্বারা কলকাতার এই আর্মেনিয়ান চার্চ নির্মাণ করা হয়েছিল।
পর্তুগিজ চার্চ:
সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পর্তুগিজরা বাণিজ্যিক কারণে কলকাতায় বসতি স্থাপন করে। শোনা যায়, জব চার্নক নাকি তাদের সাহায্যেই এখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সেখানেই খড়ের চালের অস্থায়ী উপাসনালয় তৈরী করেছিল তারা। পরে পর্তুগিজরা সুতানুটি অঞ্চল থেকে বিতাড়িত হলে, কিছুটা দূরে মুরগিহাটা অঞ্চলে তাদের বসতি এবং উপাসনালয় তৈরী করে। পরে ১৭৯৭-এ তাদের নতুন গির্জার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ১৭৯৯-এ চার্চটি খুলে দেওয়া হয়। মাঝখানে ত্রিভূজাকৃতি গঠন এবং দু’দিকে দু’টি মিনার বিশিষ্ট এই গির্জাটি কলকাতার গির্জা স্থাপত্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
সেন্ট অ্যান’স চার্চ:
ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ তৈরীর পরে সেখানে প্রার্থনার জন্য ইংরেজরা সেন্ট অ্যান’স চার্চ তৈরী করেছিল ১৭০৯ সালে। সেটি কলকাতার দ্বিতীয় প্রাচীনতম গির্জা, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম প্রেসিডেন্সি চার্চ। তৎকালীন ইংরেজ ব্যবসায়ীদের চাঁদায় তৈরী হয়েছিল গির্জাটি। মুর্শিদাবাদের নবাব আলিবর্দি খাঁ-র মৃত্যুর পরে সিরাজ-উদ্-দৌলা যখন সিংহাসনে বসলেন, ইংরেজরা পুরনো কেল্লা আরও সুরক্ষিত, মজবুত করতে শুরু করলে সিরাজ তাঁদের বারণ করেন। ইংরেজরা তা অগ্রাহ্য করায় ১৭৫৬ সালে সিরাজের কলকাতা আক্রমণ কালে কামানের গোলায় গির্জাটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
সেন্ট জনস চার্চ:
সেন্ট অ্যান’স চার্চ ধ্বংস হওয়ার পরে ইংরেজরা মুরগিহাটায় পর্তুগিজ চার্চে উপাসনা করতে যেত। কিন্তু পর্তুগিজদের ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে, ১৭৬০ সালে কেল্লার ফটকের কাছে একটি ঘর তৈরী করে সেটিকেই উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহার করত তারা। ইতিমধ্যে লন্ডনে বোর্ড অফ ডাইরেক্টর্স কলকাতায় বসবাসকারী ইংরেজদের অসুবিধার কথা মাথায় রেখে নতুন গির্জা তৈরীর পরিকল্পনা করে। ওই গির্জার ঠিক পাশের কবরখানায় রয়েছে জব চার্নকের সমাধি। ১৭৮৪ সালে সেন্ট জনস গির্জা তৈরী হয়েছিল বিভিন্ন মানুষের দানে এবং লটারি করে তোলা টাকায়। গ্রিক স্থাপত্যরীতিতে লন্ডনের সেন্ট স্টিফেন চার্চের আদলে তৈরী এই গির্জাটি, ১৭৮৭ সালে উদ্বোধন করা হয়। পাথরের তৈরী বলেই লোকমুখে এর নাম পাথুরে চার্চ।
সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ:
কলকাতার স্কটিশ গির্জাগুলির অন্যতম ডালহৌসির এই গির্জা। এটি গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। এখানেই আগে ছিল পুরনো মেয়র্স কোর্ট। ১৭৯২ সালে পুরনো আদালতের বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়। পরে ১৮১৫ সালে এই জায়গাটি স্কটিশদের গির্জা তৈরীর জন্য দেওয়া হয়। ১৮১৮ সালে গির্জাটির উদ্বোধন হয়। ১৮৩৫-এ গির্জাটির টাওয়ারে বসানো হয়েছিল একটি মূল্যবান ঘড়ি।
সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল:
আজ যেখানে ক্যাথিড্রাল চার্চটি অবস্থিত সেখানে ছিল ঘন জঙ্গল। ১৮৩৯ সালে গির্জাটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ইন্দো-গথিক স্থাপত্যের নিদর্শনে এই গির্জাটি তৈরী করতে সময় লেগেছিল আট বছর। ১৮৪৭ সালে তা সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
সেন্ট জেমস চার্চ (জোড়া গির্জা):
১৮২৬ সালে চার্চটি নির্মান হয়েছিল লেবুতলা লেনে। তবে উইপোকার আক্রমণে গির্জাটির কড়ি-বরগার শোচনীয় অবস্থা হয়। ১৮৫৮-য় সেটি হঠাৎই ভেঙে পড়ে। পরে ওই নামেই একটি গির্জা গড়ে তোলার চেষ্টা হয়। লোয়ার সার্কুলার রোডে একটি বিশাল বাগান কেনা হয়েছিল গির্জা তৈরীর জন্য। ১৮৬৪ সালে গির্জাটি তৈরীর কাজ শেষ হয়েছিল। পাশাপাশি দু’টি চূড়া থাকার দরুন লোকমুখে প্রচলিত নাম হয় জোড়া গির্জা। পরবর্তী কালে ভক্তদের দানে দেওয়া ঘড়ি ও ঘণ্টা বসেছিল একটি চূড়ায়।
চার্চ অফ আওয়ার লেডি অফ ডলার্স:
১৮০৪-এ পর্তুগিজ ব্যবসায়ী লুই ব্যারেটো বৈঠকখানা বাজার অঞ্চলে একটি চার্চ তৈরীতে উদ্যোগী হলেও তাঁর মৃত্যুতে কাজ থমকে যায়। ১৮০৯ নাগাদ গ্রেস এলিজাবেথের সাহায্যে আবারও কাজটি শুরু হয়েছিল। ১৮১০-এ চার্চটি লেডি অফ ডলার্স-এর নামে উৎসর্গ করা হয়। বাইরে যতই শব্দ আর কোলাহল হোক না কেন গির্জার ভিতরটি শব্দ প্রতিরোধক হওয়ায় শান্ত থাকে।
