আদিত্য গুপ্ত|
লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন। বাংলার বুকে ছড়িয়ে থাকা
জনশ্রুতিতে মিশে রয়েছে এক ধনকুবেরের নাম। কে না শুনেছে এই প্রবাদ বাক্যটি।
জায়গামতো ব্যবহারও করে চলেছে। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন কোথা থেকে এল এই নাম?
সত্যিই কি ইতিহাস ঢুঁড়ে এমন কোনও নামের তল পাওয়া যাবে?
এরকম আরও ছিল। বনমালী সরকারের বাড়ি। আমির চাঁদের দাড়ি। গোবিন্দরাম মিত্রের ছড়ি। ইত্যাদি। ঘটনা হল, এঁরা সকলেই ইতিহাসের লোক। কোনও বানিয়ে তোলা চরিত্র নয়। ঠিক তেমনই গৌরী সেন। রেভারেন্ড লং সাহেবের লেখা প্রবন্ধে গৌরী সেনের উল্লেখ মেলে। অর্থাৎ সত্যিই ছিলেন ভদ্রলোক। আর সত্যিই অগাধ ঐশ্বর্যের মালিক গৌরী ছিলেন দানবীরও। কাজেই, লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন— এ কোনও দম্ভের কথা নয়। এক লোকায়ত বিশ্বাসের চেহারা নিয়েছিল এক দয়াবান ধনী মানুষের এই দানশীলতা। বনমালী সরকার, আমির চাঁদের নাম আর প্রবাদ হয়ে ভেসে না থাকলেও গৌরী সেন রয়ে গিয়েছেন। কিন্তু কে এই গৌরী সেন?
তাহলে বলতে হয় রেভারেন্ড লং-এর কথা। রেভারেন্ড লংকে মনে আছে তো? সেই যিনি দীনবন্ধু মিত্রর ‘নীলদর্পণ’ নাটকের ইংরেজি তর্জমা করেছিলেন।
১৮৫০ সালে ‘ক্যালকাটা রিভিউ’ পত্রিকায় তিনি এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেই প্রবন্ধেই মেলে গৌরী সেনের কথা। জানা যায়, রাতারাতি বিপুল ধনসম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন তিনি। আসলে গৌরী সেন ছিলেন বৈষ্ণবচরণ শেঠ নামে এক ভদ্রলোকের ব্যবসার অংশীদার। এই বৈষ্ণবচরণও এক আশ্চর্য মানুষ। সেকালের অন্যতম ধনী এই মানুষটি একবার গৌরী সেনের নামে কিছু দস্তা কিনলেন। পরে দেখা যায়, সেই দস্তায় মিশে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে রুপো! তা বৈষ্ণবচরণের মনে হল, গৌরী সেন অংশীদার ছিলেন বলেই অদ্ভুত ভাবে ধনলাভ করেছেন তিনি। তিনি গৌরী সেনকেই দিয়ে দিলেন সমস্ত লাভের অংশ! আর তার ফলেই রাতারাতি বিপুল ধনী হয়ে গৌরী সেন।
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ বইতেও আমরা গৌরী সেনের উল্লেখ পাই. তবে অল্পই। পড়া যাক— ‘কোম্পানির আমলে বহরমপুর নিবাসী স্বনামধন্য প্রসিদ্ধ ব্যক্তি। কলিকাতার আহিরিটোলায় ইহার ভদ্রাসন এখনও বিদ্যমান আছে। দেনার দায়ে যাহারা জেলে যাইত এবং অর্থাভাবে যাহাদের উদ্ধারের আর উপায় থাকিত না তাহাদিগকে গৌরী সেন নিজের টাকায় ঋণমুক্ত করিয়া দিতেন। দাতাকর্ণের ন্যায় তাঁহারও নাম প্রবাদবাক্যে পরিণত হইয়াছে।’
ঋণের দায়ে কারাবন্দি হয়ে পড়লে পাশে দাঁড়ানোর কথা আমরা লং সাহেবের ওই প্রবন্ধেও পাই। সেই সঙ্গে জানতে পারি, কেবল ঋণগ্রস্ত কারাবন্দিই নয়, কোনও দরিদ্র মানুষ ভালো কাজের জন্য লড়াই করতে গিয়ে জরিমানার সম্মুখীন হলে সেখানেও এসে পড়তেন গৌরী সেন। জরিমানার টাকা দিয়ে বিপদের হাত থেকে বাঁচাতের গরিব অসহায় সেই মানুষদের।
এভাবেই
পুরনো সময়ের হারানো মানুষের কলমের ছোঁয়ায় আজও এই সময়ের বুকে ভেসে রয়েছে কবেকার এক
দানবীর দয়ালু মানুষের কথা। কত আগের? লং সাহেবের লেখাটি ১৮৫০ সালের। তিনি উল্লেখ
করেছেন সেই সময়েরও প্রায় একশো বছর আগে বৈষ্ণবচরণ শেঠ কলকাতায় বাস করতেন। যেহেতু
গৌরী সেনও তাঁর সমসাময়িক, সুতরাং তিনিও ওই সময়েরই। অর্থাৎ ১৭৫০ সাল বা তার আশপাশের
সময়। ভারত তখনও পরাধীন হয়নি। কিংবা হয়তো সদ্য পলাশীর যুদ্ধের পরে পরাধীনতার
শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছে।
সুতরাং বুঝতেই পারছেন কবেকার কথা। পুরনো লেখার ভিতরে রয়ে যাওয়া ওই সামান্য উল্লেখ ছাড়া আর কোথাও নেই তিনি। তবু তাঁর দানশীলতা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রবণতার জলছাপ আজও লোকশ্রুতির মধ্যে রয়ে গিয়েছে। তৈরি করেছে মিথ। লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন।
