গল্পকুটির ওয়েব ডেস্ক|

তুতেনখামেন ছিলেন প্রাচীন মিশরের ‘তুতমসিদ’ বংশের শেষ সম্রাট। মোট ১০ বছর রাজত্ব করার পর মাত্র ১৯ বছর বয়সেই মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। তবে মৃত্যুর কারণ কী ছিল তা সঠিকভাবে জানা যায়নি।

তিনি ‘কিং টুট’ নামে পরিচিত ছিলেন ইউরোপিয়ানদের কাছে। তাঁর মৃত্যুর পর দেশ-বিদেশের বহু প্রত্নতত্ত্ববিদ তাঁর পিরামিড নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। দীর্ঘকাল ব্যাপী পরীক্ষানিরীক্ষার পর হাওয়ার্ড কার্টার এবং লর্ড কার্নারভান তুতেনখামেনের রত্নখনি আবিষ্কার করেছিলেন। তারপর থেকে শুরু হয়েছিল এক মারণ খেলা।

জানা গিয়েছে, গভীর খননকার্য চালানোর পর আবিষ্কৃত হয়েছিল তুতেনখামেনের সমাধিকক্ষের প্রধান ফটকের সিঁড়ি। ওই সমাধি উন্মোচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল ১৯২২ সালের ২৬ নভেম্বরকে। এই  ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই লর্ড কার্নারভার হঠাৎ মারা যান। এটাই ছিল সূত্রপাত। এরপর থেকে একের পর এক অঘটন ঘটতে শুরু করেছিল। ঘটনাগুলি প্রকাশ্যে আসতেই প্রশ্ন ওঠে তুতেনখামেনের সমাধিতে পা রাখলেই কী মৃত্যু ঘটবে?

সেই রহস্যময় সমাধির টানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু পর্যটক এসে ভিড় জমাতে শুরু করেন। কার্নারভার সেই সময় ছিলেন ইংল্যান্ডে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়ে মিশরের রাজধানী কায়রোতে চলে আসেন। কয়েক দিন পর তিনি কোমায় চলে যান এবং ১৯২৩ সালের ৫ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়। তবে কার্টারের সঙ্গে এমন কিছু হয়নি, তিনি ৭৫ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন।

কার্নারভানের মৃত্যুর পর থেকেই কায়রোতে একধরণের অন্ধকার সময় নেমে আসে। বলা হয়, ওই সময় আশ্চর্যজনকভাবে কায়রোর বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আরও অদ্ভুত বিষয় হল কার্নারভানের মৃত্যুর একই সময় লন্ডনে থাকা তার পোষ্য কুকুরটিও হাঠাৎ মারা যায়। তুতেনখামেনের রত্নখনির সেই মৃত্যুলীলাকে ঘিরে এই প্রাচীন প্রবাদটির প্রচলন হয়, “তুতেনখামেনের সমাধিতে যে পা রাখবে, মৃত্যুই হবে তার শেষ আশ্রয়।”

শোনা যায়, কার্নারভানের মৃত্যুর পরবর্তি সময় তার পুত্র একজন অচেনা রমণীকে প্রায়শই দেখতে পেতেন। শুধু তাই নয়, ওই অজ্ঞাত রমণী তাকে বারবার সতর্ক করে বলতেন, ‘যদি সে মৃত্যু বরণ করতে না চায়, তাহলে সে যেন তার পিতার সমাধিস্থলে পা না রাখে।‘ সেই ভয়ে কার্নারভানের পুত্র কখনোই বাবার কবরখানায় পা রাখেননি।

শুধু কার্নারভানই নয়, ওই সমাধির সঙ্গে যুক্ত অনেকেই আশ্চর্যজনকভাবে মৃত্যু বরণ করেছিল। এদের মধ্যে বেশকিছু জন পর্যটকও ছিলেন। তবে অনেকেই এই ঘটনাকে বিশ্বাস করেন না। তাদের মতে, ওই সকল পর্যটকরা আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন। আবার অনেকে বলেন, সমাধিতে ঢোকার সময় তাদের স্নায়বিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়ে অথবা ধুলো-বালির জন্যই টোম্বের ভিতরে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটেছে।

বিভিন্ন গবেষকরা এই রহস্যময় সমাধি সম্বন্ধে নানারকম মত প্রকাশ করেছেন। যেমন, কারোর মতে, তুতেনখামেনের টোম্বে যে সকল বস্তু বা রত্ন দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে রাখার জন্য সেগুলির ওপর মিশরীয়রা এক বিশেষ ধরণের বিষ মাখিয়ে রাখত। ফলে বস্তুগুলির সংস্পর্শে কোনো মানুষ আসা মাত্রই তাদের শরীরে এক বিশেষ জীবাণু প্রবেশ করত এবং অসুস্থ হয়ে তারা মারা যেত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীন দ্রব্য সামগ্রীর বিভাগীয় প্রধান ডঃ গ্যামেল মেহেরেজ, তুতেনখামেনের সমাধির সমস্ত ঘটনার অবিশ্বাস করে টোম্ব থেকে কিছু জিনিস নিজের সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন। কিন্তু তরপরেই মাত্র ৫২ বছর বয়সে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়।

এই সকল ঘটনায় আকর্ষিত হয়ে ১৯৮০ সালে ইউরোপের একটি দল ওই সমাধিতে একটি সিনেমার শুটিং করতে আসে। তবে যেদিন শ্যুটিং শুরু হবে ওই সিনেমার মুখ্য চরিত্রের অভিনেতার গাড়ি একটি খাদে পড়ে গিয়ে তার একটি পায়ের হাড় যায়। পরে অন্য অভিনেতাকে দিয়ে শ্যুটিং শুরু করার কথা বললেও কেউ ওই জায়গায় যেতে রাজি হয়নি।

এরকম আরো অনেক ঘটনা রয়েছে তুতেনখামেনের সমাধিকে কেন্দ্র করে। এই সকল মৃত্যুর নেপথ্যে ঠিক কী কারণ আছে তা এখনো অধরা। তবে অনেকেই মনে করেন হাজার হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা এই রত্নখনির ঘুম না ভাঙালেই ভালো হত, তাহলে হয়তো এতগুলো প্রাণ যেতো না।

এই বিষয়টি নিয়ে মানুষের কৌতূহল এতটাই বেশি ছিল যে ওই রত্নখনিকে কেন্দ্র করে বহু সিনেমা তৈরি হয় এবং সেগুলি সাফল্যও পায়। ১৯৮৯ সালে সর্বপ্রথম কলম্বিয়া পিকচার্স থেকে নির্মিত হয় “দ্য কার্স অব কিং টুট’স টোম্ব” । এছাড়া “ইয়ং ইন্ডিয়ানা জোনস এন্ড দ্য কার্স অব দ্য জ্যাকল”, “ইয়ং ইন্ডিয়ানা জোনস এন্ড দ্য ট্রেজার অব পিকক’স আই”, টিনিটিন সিরিজের ‘দ্য সেভেন ক্রিস্টাল বলস’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

সব শেষে একটাই কথা বলতে হয়, ‘বিশ্বাসে মিলায়ে বস্তু তর্কে বহুদূর’। তবে তুতেনখামেনের সমাধির রহস্য আজও অধরা। কেন এতগুলো মানুষ প্রাণ হারাল? সত্যি কি বিষাক্ত পদার্থের জন্য এই ঘটনাগুলি ঘটেছিল? না কি এই সব কিছুর পিছনে রয়েছে একটি অন্ধকারময় অভিশাপ! এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। বলা বাহুল্য বর্তমানে মিশরের আইন অনুযায়ী, এখন শুধুমাত্র মিশরীয়রাই তুতেনখামেনের টোম্ব নিয়ে গবেষণা করেতে পাড়বে, এছাড়া কোনো বিদেশী গবেষকদের সেই সুযোগ দেওয়া হয় না।  

তথ্যসূত্রঃ আজও যা রহস্য – পৃথ্বীরাজ সেন, হায়রোগ্লিফের দেশে – অনির্বাণ ঘোষ