গল্প কুটির ওয়েব ডেস্ক|

মমি নিয়ে মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত এই নিয়ে গবেষণা চলে আসছে। ইতিহাসে সুপ্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার কথা পড়েই আমরা মমির সাথে পরিচিত হয়েছি। এছাড়া বহু সিনেমাতেও মমির দেখা পাওয়া গিয়েছে। তবে মমির কথা বললে আমাদের সাধারণত তুতেনখামেনর অভিশপ্ত মমির কথাই মনে পরে। তবে আজ আমরা আলোচনা করব একজন নারীর রহস্যময় মমি নিয়ে। যার বর্তমান বয়স ২৬০০ বছর।  

এই মমিটিকে পরীক্ষা করে জানা গিয়েছে এই নারীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। তাঁর সেই মৃত্যুর রহস্য সামনে এলো ২০২০ সালে। এই মমিটি মিশরের পশ্চিম থিবসের সুপ্রাচীন সমাধি থেকে ১৮৩৪ সালে উদ্ধার করা হয়েছিল। তারপর এটি উত্তর আয়ারল্যান্ডের হলিউড শহরের এক শিল্প সংগ্রাহক, থমাস গ্রেগ প্রচুর দাম দিয়ে কিনেছিলেন। তবে আয়ারল্যান্ডে এই মমিটি নিয়ে আসার পরেই সারা শহরে এক অদ্ভুত রকমের চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়ে যায়। ১৮৩৫ সালে থমাস গ্রেগ মমিটিকে নিজের কাছে না রেখে উলস্টার মিউজিয়াময়ে দিয়ে আসেন।

ওই বছরেই বেলফাস্ট ন্যাচরাল হিস্টরি মিউজিয়াম-এ মমির কফিনটি প্রথম খুলেছিলেন মিশর প্রত্নতত্ত্ববিদ এডয়ার্ড হিঙ্কস। এর পর তিনি সেই মিশরীয় মমিটির উপর গবেষণা শুরু করেছিলেন। সারকোফেগাসটি খোলার আগে তার ওপর খোঁদাই করা হায়ারোগ্লিফিক লিপি পড়ে তিনি বলেছিলেন ওই মমিটি একজন মহিলার। যার নাম তাকাবুতি। মৃত্যুর সময় এই মহিলার বয়স ছিল ২০-৩০ বছরের মধ্যে।

আরও জানা যায় তাকাবুতি একজন সম্ভ্রান্তবংশের মেয়ে ছিলেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের মতে, তাকাবুতি কোনও সম্ভ্রান্তবংশের বউ বা রক্ষিতাও হতে পারেন। সে বিষয়টি ঘিরে এখনও জল্পনা রয়েছে। জানা গিয়েছে, তাকাবুতির বাবার নাম ছিল নেসপার। তিনি মিশরীয় দেবতা আমুন-এর পূজারি ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম ছিল তাসেনিরিক।

তবে রহস্য এখানেই শেষ নয় বরং আরও জটিলতা শুরু হয় সারকোফেগাস খোলার পর। মমিটিকে দেখা মাত্রই আঁতকে উঠেছিলেন পুরাতত্ত্ববিদ এডয়ার্ড হিঙ্কস। তাঁর সারা জীবনের অভিজ্ঞতায় এমন আশ্চর্যজনক মমি আগে কখনও দেখেননি তিনি। কুচকুচে কালো বর্ণের মুখ ও সোনালি রঙের চুল নিয়ে সকলকে অবাক করে দিয়েছিল মমিটি। সেই সময়কার সংবাদপত্র জুড়ে তাকাবুতিকে নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছিল।

জানা গিয়েছে, তাকাবুতি মারা যান মিশরে ২৫তম রাজবংশের রাজত্বের শেষের দিকে। গবেষকরা ‘ফেস রিকন্সট্রাকশান’ পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে দেখেছিলেন জীবিত অবস্থায় কেমন দেখতে ছিলেন তাকাবুতি। সেখান থেকেই জানা যায় অপরূপ সুন্দরী ছিলেন তাকাবুতি।

এর পরেই সামনে আসে আরও একটি রহস্য। তাকাবুতির মমিটির বামদিকের পিঠে একটি ক্ষত চিহ্ন লক্ষ্য করেন গবেষকরা। এই নিয়ে পুনরায় শুরু হয় গবেষণা। সেই গবেষণা শেষ হয় এই বছরের জানুরারি মাসে। আধুনিক নানা পদ্ধতিতে মমিটির পরীক্ষা করা হয়েছিল। প্রয়োজনে করা হয়েছিল তাঁর সিটিস্ক্যান এবং ডিএনএ টেস্ট। সেখান থেকেই গবেষকরা জানতে পেরেছিলেন তাকাবুতিকে খুন করা হয়েছিল। বড় ছুরির মতন কোনও ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুন হয়েছিলেন এই সুন্দরী।

তবে তাকাবুতি রহস্য এখানেই শেষ হয়নি। মমিটির ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট থেকে উঠে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। মিশরীয় ডিএনএ-এর সঙ্গে তাকাবুতির ডিএনএ-এর কোনওরকম মিল পাওয়া যায়নি। আশ্চর্যভাবে ওই মমিটির ডিএনএ-এর সঙ্গে মিল রয়েছে ইউরোপীয় ডিএনএ-এর। তবে কী করে তাকাবুতিকে মিশরে এনে মমি করে সমাধিস্থ করা হয়েছিল? তাহলে মিশরীয় সেই দম্পতি তাঁর মা-বাবা হলেন কীভাবে! এ বিষয় নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। বিশ্বে নানা ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই রহস্যের গিঁট খোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।