গল্প কুটির ওয়েব ডেস্ক|
কথায় আছে ম্যান অ্যান্ড অ্যানিম্যাল কনফ্লিক্ট। যদিও প্রকৃতি কোনো একজনের নিজস্ব সম্পদ নয়। এই বৈচিত্রময় প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠে উদ্ভিদ ও জীবকুল, প্রকৃতি তাদের সকলের। কিন্তু এই ধারণা পোষণ করা মানুষও অনেকসময় ভুলে যায় মানুষের দোষেই পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে বহু প্রাণী। সেই তালিকাতেই রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ‘রাজ্য প্রাণী’। এত বড় তকমা পাওয়া এই প্রাণীও আজ ক্রমশ বিলুপ্তির পথে। তাতে মানুষেরও যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু শহুরে হোক বা গ্রাম্য সব মানুষের এই প্রাণী সম্পর্কে ধারণা নগণ্য।
কয়েক দশক আগেও বাংলার বিভিন্ন জায়গায় ইতিউতি দেখা মিলত বাঘরোলের। এই বাঘরোল বা ফিশিং ক্যাট মূলত নিরাপদ নির্জন জায়গায় একটু আলাদা হয়েই থাকতে ভালোবাসে। নিশাচর এই স্তন্যপায়ী বন্যপ্রাণী রাতে জনবসতি অঞ্চলে আসে, জলার মাছ খেতে। পছন্দ বলতে ওটাই একমাত্র তার। এতেই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য প্রাণীর ভাগ্যে জোটে চোরের অপবাদ। তবে শুধু এই অপবাদে সন্তুষ্ট হয় না মানুষ। দুর্ভাগ্যবশত ধরা পড়লে অত্যন্ত ভীতু এই প্রাণীকে পড়তে হয় অসম্ভব প্রহারের মুখে। মানুষের রোষের বশে প্রাণ যায় তার। কখনও বা মাছ খেয়ে খিদে মেটানোর আগেই মানুষ মেরে ফেলে তাদের, কারণ- ভয়! বাঘরোল নিয়ে গ্রাম্য মানুষের নানা কুসংস্কারও আছে। আর যে কয়েকটি বাঘরোল অবশিষ্ট আছে তাদের প্রাণও বিপন্ন। যে হারে গ্রামাঞ্চলেও বন জঙ্গল কেটে ফেলা হচ্ছে, বুজিয়ে ফেলে হচ্ছে জলাজমি তাতে খুব শীঘ্রই এই প্রজাতি হয়ে পড়বে খাদ্য-বাসস্থান-শূন্য। আশ্চর্যের বিষয় এই যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের তালিকায় বাঘ যে শ্রেণীভুক্ত বাঘরোলও সেই একই শ্রেণীর অন্তর্গত, কিন্তু সেই গুরুত্ব কখনও দেওয়া হয় না অতিবিরল এই প্রাণীর ক্ষেত্রে।
ফিশিং বিড়ালের বৈজ্ঞানিক নাম প্রিয়োনাইলিউরাস ভাইভারিনাস। এটি একটি বন্য প্রজাতি যার শিকার ধরার জন্য কিছু আকর্ষণীয় পদ্ধতি রয়েছে। প্রাণীটি মাছ ধরার জন্য জলে ডুব দেয় এবং তার পাঞ্জা দিয়ে শিকার করে। এটি জলজ প্রাণীর পাশাপাশি স্থলের প্রাণী যেমন মেঠো ইঁদুর ইত্যাদি খেয়েও জীবনধারণ করে। প্রাণীটির গায়ে ডোরাকাটা ও ছোপছোপ দাগ রয়েছে এবং এটি একটি গৃহপালিত সাধারণ বিড়ালের চেয়ে দ্বিগুণ বড়। যে কোন অচেনা শব্দের প্রতি যেমন এরা সজাগ, তেমনই চতুর। এটি দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে পাওয়া যায় এবং জলাভূমি অঞ্চলে বা তার কাছাকাছি বাস করে। বিগত কয়েক দশকে বাঘরোলের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সরকারি মর্যাদাসম্পন্ন এই প্রাণীকে শুধুমাত্র বাঘ সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় বহু জায়গায়। আই.ইউ.সি.এন. ২০০৮ সালে এই মেছো বাঘকে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। হয়তো এরা এই জায়গায় আজ পৌঁছতই না, যদি তাদের অস্তিত্বকে মেনে একসাথে প্রকৃতিকে আপন করে নিত মানুষ।
বন্যপ্রাণী আইনে বাঘ ও বাঘরোল – দুটি প্রাণীই প্রথম তফশিল ভুক্ত। অর্থাৎ বাঘ মারা যেমন অপরাধ, বাঘরোল মারাও। অথচ পশ্চিমবঙ্গ সরকার তথা ভারত সরকারের তরফে এই অতিবিরল প্রাণীটিকে সংরক্ষণ করতে সেরকম কোনও উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য হাওড়া আমতার কালবাস গ্রামে প্রায় তিনশো বছরের পুরনো একটি প্রাসাদের ভগ্নপ্রায় অংশকে সংস্কার করে সম্প্রতি তৈরী করা হয়েছিল ‘বাঘরোল বাসা’। তবে নেহাতই ট্যুরিসম নয় ‘ফরেস্ট ডুয়েলার’ সংস্থাটির লক্ষ্য অনেক বড়। কিন্তু স্থানীয় ভূমি মালিকের সাথে বিরোধের কারণে এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায় গত ডিসেম্বরে। হাওড়া অঞ্চলের বিপন্ন প্রাণী বাঘরোল সংরক্ষণের মহাযজ্ঞে নেমেছে এই সংস্থা। তাঁদের দাবি শীঘ্রই তাঁরা ফিরে আসবে নতুন অবস্থান নিয়ে। তবে শুধু একটা গোষ্ঠী নয় সব মানুষ এগিয়ে এলে তবেই এই কর্মযজ্ঞে সফলতা সম্ভব। ভবিষ্যতে চিড়িয়াখানা বা সংগ্রহশালা যাতে বাঘরোলের শেষ ঠিকানা না হয় তার ভার নিতে হবে রাজ্যবাসীকেই।
ছবিঃ সান দিয়েগো জু অ্যানিমালস অ্যান্ড প্ল্যান্টস, উইকিপিডিয়া


কমেন্টস
important and exclusive information