গল্প কুটির ওয়েব ডেস্ক।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্য কোনও নতুন কিছু নয়। ছোট থেকে সেই পারিবারিক পরিসরের মধ্যে থেকে বড় হয়ে কর্মক্ষেত্রে সব জায়গাতেই মেয়েদের লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হতে হয়। সত্যি বলতে আমাদের দেশে যেসব মেয়েরা নিজেদের পা দাঁড়িয়ে কোনওকিছু করার চেষ্টা করেছেন, সেই পথ কিন্তু তাদের কাছে খুব একটা সরল ছিল না। এসেছে বহু বাধা-বিপত্তি। কিন্তু সেসব হেলায় অতিক্রম করে তাঁরা এগিয়ে গিয়েছেন নিজের লক্ষ্যে। তেমনই একজন হলেন সুধা মূর্তি। দেশের অন্যতম তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা ইনফোসিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন সুধা মূর্তি সর্বদা একটা বিষয় বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, জীবনে যত উঁচুতেই ওঠা যাক না কেন, দু-হাতে সাফল্যের শিখর ছুঁলেও পা যেন থাকে মাটির কাছাকাছি। আসলে জীবনের এই মন্ত্র নিজেই সারা জীবন মেনে এসেছেন সুধা। ভারতবর্ষের অন্যতম ধনী মহিলা হয়েও সরলতাকেই জীবনের মূল মন্ত্র হিসাবে গড়ে তুলেছেন সুধা মূর্তি।

তথাকথিত নামী-দামি ধনী ব্যক্তিরা যাঁদের জীবন-যাপনের ধারা খুবই উচ্চমানের। দামি শাড়ি, দামি গহন ছাড়া যাঁদের ভাবাই যায়না, সেই দৌড় থেকে নিজেকে বহু দূরেই রেখেছেন সুধা মূর্তি। একবার একটি সাক্ষাতকারে সুধা মূর্তি জানিয়েছিলেন, একবার কাশি গিয়েছিলেন তিনি। সেখানের পবিত্র গঙ্গায় স্নান করেল একটা কিছু, যা আপনার খুব পছন্দের তা ত্যাগ করে আসতে হয়। তিনি তখন শাড়ি কেনা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর সম্পর্কে একথা শোনা যায় যে, গত ২১ বছরে নিজের জন্য একটি শাড়িও কেনেননি সুধা। তাই নিজের দৈনন্দিন জীবনের একান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি ছাড়া আর কিছুই কেনেন না তিনি।

এমন এক জগতে যেখানে পার্থিব জিনিসপত্রের প্রতি মানুষের টান সবচেয়ে বেশি, সেখানে পার্থিব জিনিস হেলায় দূরে রেখে জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি নিয়েই কীভাবে সন্তুষ্ট থাকা যায়, সেই শিক্ষাই নিজের জীবন দিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছেন সুধা মূর্তি। সুধা মূর্তি আরও জানিয়েছিলেন যে, জীবনে এই ত্যাগ তাঁকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছিল। তবে জীবনের এই মূল্যবোধ কিন্তু একদিনে পৌঁছাননি তিনি। বড় হয়ে ওঠার পথে এসেছিল অনেক বাধা। একসময় পড়াশোনার জন্য দারুণ লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে যখন তিনি কলেজে পড়বেন বলে স্থির করেন, সেইসময় তাঁর এলাকার অন্যান্য মেয়েরা সবদিক থেকেই অনেকখানি পিছিয়ে ছিল। এরপর যে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে তিনি ভর্তি হন, সেখানে ৫৯৯ জন ছেলের সঙ্গে পড়তে গিয়েছেলেন তিনি একা একটি মেয়ে। এতগুলি ছেলের মাঝে একা মেয়ে হওয়ায় তাঁকে রীতিমতো নিয়মের বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হয়েছিল তাঁকে। কলেজের অধ্যক্ষ তাঁকে তিনটি শর্ত দিয়েছিলেন। প্রথমত, তিনি কখনও ক্যান্টিনে যেতে পারবেন না,  দ্বিতীয়ত, কোনও ছেলে সহপাঠীর সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না এবং তৃতীয়ত, তাঁকে সবসময় শাড়ি পরে কলেজে আসতে হবে। অধ্যক্ষের সব শর্তেই বিনা দ্বিধায় মেনে নিয়েছিলেন সুধা। সেইমতো এক বছর কলেজের কোনও ছেলের সঙ্গেই কথা বলেননি সুধা। কিন্তু এক বছর পর যখন পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করলেন তখন ছেলেরাই নিজে থেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে এসেছিল। এইভাবে একসময় কর্ণাটকের গণ্ডি পেরিয়ে সারা দেশের গর্ব হয়ে ওঠেন সুধা মূর্তি।

এভাবেই নিজের পরিচিতি গড়েছেন তিনি। তাঁর এই অতি সাধারণ জীবনযাত্রায় তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন তাঁর স্বামী নারায়ণ মূর্তি। এক সাক্ষাতকারে সুধা মূর্তি বলেছিলেন, নারায়ণ মূর্তির সরলতাই তাঁকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। সুধা মূর্তির কথায়, তাঁর স্বামী ছিলেন অত্যন্ত সৎ এবং সরল-সাদাসিধে মানুষ। তিনি কখনওই তাঁর সৌন্দর্য এবং পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। ইনফোসিসের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি সুধা মূর্তি একজন লেখকও বটে। আর সেই কারণে তিনি এবং তাঁর স্বামী জীবনে যে জিনিসটির পিছনে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছেন তা হল বই। দম্পতির ২টি লাইব্রেরি রয়েছে যেখানে প্রায় ২০,০০০-এরও বেশি বই রয়েছে। বইপ্রেমী হওয়ার দরুন তিনি কাউকে বই দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, অন্যের থেকে বই নিয়ে পড়ার চেয়ে সকলের বই কেনার প্রতি একটা উৎসাহ থাকা খুবই জরুরী। তিনি আরও বলেন, লেখকদের বাঁচিয়ে রাখার একটিমাত্র উপায় হল তাঁদের লেখা বই কেনা। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি একজন মানবাধিকার কর্মীও বটে। যুক্ত থেকেছেন বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে। ইনফোসিস ফাউন্ডেশনের হয়ে ১৬,০০০ টয়লেট গড়ে তুলতে সাহায্য করেছেন তিনি। নিরন্তর কাজ চালিয়ে গিয়েছেন দেবদাসী সম্প্রদায়ের জন্যও। নারী দিবসের প্রাক্কালে সুধা মূর্তিকে গল্প কুটিরের কুর্নিশ।