রানু ভট্টাচার্য|

প্রাচীন মিশরে স্বর্ণযুগের সৃষ্টি করেছিলেন যে প্রথম মহিলা ফ্যারাও, ইতিহাসে তাঁর ঠাই হয়নি। তিনি তলিয়ে গেছেন বিস্মৃতির অন্ধকারে। যে সময়ে নারীদের কোন অধিকারকেই স্বীকৃতি দেওয়া হত না, তেমন সময়ে যে নারী নিজেকে ফারাও ঘোষনা করার সাহস দেখিয়েছিলেন তিনিই রানী হাতশেপসুট।

সময়টা আনুমানিক ১৪৭৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। ফ্যারাও ‘তুতমোসিস ২’ এর মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম স্ত্রী এবং সৎ বোন ‘হাতশেপসুট’ দখল করেন ক্ষমতা। হয়ে ওঠেন সেনাবাহিনীর সর্বেসর্বা। পুত্রসন্তান ‘তুতমোসিস ৩’ তখনও সিংহাসনের যোগ্য না হওয়ায় তাকে যুদ্ধকলা শিখতে পাঠিয়ে দেন দূরে।

আনুমানিক ১৪৭০ খ্রীষ্টাব্দে ফ্যারাও হাতশেপসুট শুরু করেন তাঁর রাজত্বের স্বর্ণযুগ। যে সময়কে বলা হত ‘গোল্ডেন এজ অফ কন্সট্রাকশান।’ তিনিই গড়ে তুলেছিলেন মিশরের বৃহত্তম সেনাবাহিনী। যার উপর ভিত্তি করে তিনি মিশরের বাইরেও সাম্রাজ্য বিস্তার করার কথা ভেবেছিলেন। হাতশেপসুটই প্রথম মিশরীয় ফ্যারাও, যিনি আক্রমণ করেছিলেন ‘পুন্ট উপত্যকা’। প্রমাণ করে দিয়েছিলেন নারী হলেও তিনি মোটেই তুচ্ছ নন, দেবীর মতোই আরাধ্যা ছিলেন প্রজাদের কাছে। এই দেবীর হাত ধরেই বদল ঘটে মিশরীয় সভ্যতার, প্রথমবার কোন বিদেশী গাছের সফল ‘ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন’ হয়েছিল মিশরে।

 কিন্তু এমন একজন দেবীকেই সম্পূর্ণ মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল ইতিহাস থেকে। এ এক বিশাল ষড়যন্ত্র। যে ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যায় ‘দের ও বাহারি’ মন্দিরের বিশাল ওবেলিস্ক গুলিতে।

১৪৫৮ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে যখন হাতশেপসুট মারা যান তখন খবর রটে যে তাঁকে গুপ্তহত্যা করা হয়েছে। কিন্তু মন্দিরের পুরোহিত সম্পূর্ণ অন্যকথা বলেন, তাঁর মতে এক অজানা রোগে মারা যান হাতশেপসুট। রাজ্যে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ঠিক সেইসময় ফিরে আসেন হাতশেপসুটের পুত্র ‘তুতমোসিস ৩’, যিনি খুব যত্ন সহকারে হাতশেপসুটের অস্তিত্বকে মুছে দেওয়ার চক্রান্ত শুরু করেন। রানীর মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে না ফেললেও, ভেঙ্গে ফেলা হল মূর্তির মাথাগুলোকে, ঘষে তুলে ফেলা হল তাঁর নাম। কিন্তু মেঘের আড়ালে যেমন সূর্যকে ঢাকা যায় না, তেমনই শত ষড়যন্ত্র সহযোগেও রানীর অস্তিত্ব মুছে ফেলতে পারেনি তাঁর পুত্র। তাই প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পরেও আবিষ্কৃত হয় রানী হাতশেপসুটের নাম। আশা করি একদিন তিনি ঠাই করে নেবেন ইতিহাসের পাতায়।

তথ্যসূত্র – মিশরের রহস্যময়ী রানীরা – বিশ্বজিৎ সাহা