শুভজিৎ দে|
আজকের লেখাটা একটু অন্যরকম। তবে শুধু লেখা বললে ভুল হবে, কারণ এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে আঠারো শতকের বেশ কিছু প্রাচীন চিত্র। যেগুলি পরবর্তীকালের ভারতীয় চিত্রশিল্পকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেছিল। মুঘল সম্রাটদের সূক্ষ্ম রুচি ও শিল্পবোধের নিদর্শন কেবলমাত্র স্থাপত্যশিল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তাঁরা চিত্রকলারও অনুরাগী ছিলেন, এবং তার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। বিখ্যাত চিত্র সমালোচক ডঃ অশোক কুমার দাস মন্তব্য করেছেন, “The Mughal school of painting represents one of the most significant phases of Indian art.”
মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের দীর্ঘকাল পরেও এর প্রভাব উত্তর ভারত, দাক্ষিণাত্য, রাজস্থান ও পঞ্জাবের পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী একটা ছাপ ফেলেছিল। প্রায় প্রত্যেক মুঘুল সম্রাটই চিত্রশিল্পে আগ্রহী ছিলেন এবং তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ। এর ফলে ভারতীয় চিত্রকলায় একটি নতুন রূপ পরিগ্রহন করেছিল। রাজ প্রাসাদই ছিল শিল্পচর্চার মূল কেন্দ্র।

মুঘল সম্রাটরা যদি চিত্রাঙ্কনে উৎসাহ না দিতেন, তাহলে ভারতীয় চিত্রকলা অবশ্যই অনেকটা দরিদ্র থেকে যেত। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, সমগ্র সুলতানি যুগে কোনো ছবি বা চিত্রিত পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়নি, কারণ দিল্লির সুলতানরা অঙ্কন শিল্পের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন না। এ কথার অর্থ অবশ্য এই নয় যে, ছবি আঁকার রেওয়াজ উঠে গিয়েছিল। আমির খসরু, সামস-ই-সিরাজ-আফিফ, মৌলানা দাউদ প্রভৃতির লেখায় দেওয়াল চিত্র অঙ্কন ও শিল্পীদের কথা জানা যায়। কিন্তু সুলতানি রাজসভায় চিত্রাঙ্কন পৃষ্ঠপোষকতার অভাব আমাদের বিশেষভাবে চোখে পড়ে। আর মুঘল আমলে সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছিল। মুঘল চিত্রাঙ্কন শিল্পে ধর্ম প্রাধান্য পায়নি। তাঁদের বিষয়বস্তু ছিল রোমান্টিক প্রেম ও ভালোবাসা, যুদ্ধ, মুসলিম ও রাজপুত শিভালরি (Chivalry) ইত্যাদি।
ভারতে মুঘলরা আসার আগেই পুঁথিপত্র চিত্রায়ণের কাজ শুরু হয়ে যায়, পূর্ব ভারতে পাল রাজাদের আমলে বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধ পুঁথি চিত্রণ চলতে থাকে। জৈন পুঁথি চিত্রণ পদ্ধতি, যাকে পশ্চিম ভারতীয় পুঁথি চিত্রণ বলে বলা হয়েছে, সেগুলিও চলতে থাকে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সুলতানী যুগ প্রতিষ্ঠিত হলে পারসিক চিত্রকলার প্রভাব জৈন পুঁথি চিত্রণের উপরে পড়তে থাকে। এইগুলিতে পারসীক রঙের ব্যবহার, বিশেষ করে নীল রং এবং শাহী নামে পরিচিত বিদেশী রাজার মূর্তি স্থান পেতে থাকে। ওই সময় পারসীক চিত্রকলার রেখা, প্রাকৃতিক দৃশ্য, চিত্রভূমির বিভাজন ইত্যাদিও লক্ষ্য করা যায়।

মুঘল যুগের চিত্রকলার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হুমায়ুন। দিল্লীর সিংহাসন হারিয়ে তিনি যখন পারস্য ও আফগানিস্তানে আশ্রয় নেন তখনই তাঁর সঙ্গে পরিচিত হন পারস্যের দু’জন বিখ্যাত চিত্রকর মীর সৈয়দ আলী এবং আব্দুস সামাদ। তাঁরা মুঘল সাম্রাজ্যের অস্থায়ী রাজধানী কাবুলে কাজ শুরু করেন, সেখানেই অল্প বয়েসে আকবর চিত্রকলার শিক্ষা নেন। ওই সময় অঙ্কিত আব্দুস সামাদের কয়েকটি ছবি পরবর্তীকালে জাহাঙ্গির সংগ্রহ করে গুলশান অ্যালবামে রেখেছিলেন। হুমায়ুন দিল্লিতে ফিরে এলে তাঁর সঙ্গে দিল্লী আসেন পারস্যের সেই দুই চিত্রশিল্পীও। তাঁরা দিল্লিতে একটি বড় কারখানা (বর্তমান দিনের স্টুডিও) তৈরি করেন। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে জ্ঞানীগুনি শিল্পীদের সেখানে আনা হয়। কয়েক বছরের মধ্যে সেখান থেকে কয়েকটা পুঁথি চিত্রণ বেরিয়ে আসে। এগুলির মধ্যে ‘হামজানামা’ অন্যতম একটি।

পরবর্তীকালে আকবরের রাজসভায় স্বকীয় একটি শিল্পশৈলী গড়ে উঠেছিল। প্রথমদিকের কাজে পারসীক রূপকথার প্রভাব দেখা যায়, আর এই পারসীক চিত্রকলার পরম্পরা থেকে ক্রমশ ভারতীয় বাস্তবতা ওই সব অনুচিত্রে এসে যায়। দক্ষ চিত্রশিল্পীরা মুঘল কারখানায় কাজ পেতে থাকেন, তারা নতুন পারসীক আঙ্গিক গ্রহণ করলেও পুরনো শিক্ষা পদ্ধতি বিসর্জন দেননি। আকবর মুসলিম ধর্ম ত্যাগ না করেও অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলেন, উনি হিন্দু ধর্মগ্রন্থের পারসীক অনুবাদ করান, এবং সেই অনুবাদগুলির সঙ্গে চিত্র অঙ্কন করাও হয়েছিল। এই চিত্রায়নের ভার দু’জন পারসীক শিল্পীর হাতে থাকলেও বহু ভারতীয় চিত্রকর সেখানে কাজ করতেন। কালক্রমে তাঁদের অনেকেই হয়ে ওঠেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী। এদের মধ্যে উল্লেখ হলেন দাসওয়ান্ত, বাসাওয়ান, কেশব, মহেশ প্রমুখরা।

একমাত্র রজমনামা পুঁথিতেই দাসওয়ান্তের আঁকা চিত্রের নিদর্শন পাওয়া যায়, তবে সেখানে তিনি সম্পূর্ণ কাজ শেষ না করেই মারা গিয়েছিলেন, ফলে তার ফেলে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করেন অন্য এক চিত্রকর। অন্যান্য চিত্রেও এই রজমনামার প্রভাব পড়েছিল বলে মনে করা হয়। রামায়ণ পুঁথি চিত্রণটি সমাপ্ত হয় রাজকীয় চিত্রশালায় নভেম্বর ১৫৮৮ সালে। আবুল ফজল বলেছেন, প্রায় সবাই এই কাজে অংশ নেন। এর মধ্যে ১৭৬টি চিত্র আছে।
১৬০২ সালে আবুল ফজল মারা গেলে আকবরনামা অসম্পূর্ণ থাকে। কিন্তু ১৫৯০ থেকেই আকবরের আদেশে এর চিত্রণ শুরু হয়, যার মধ্যে একটি নতুন আঙ্গিক উঠে এসেছিল, এর মধ্যে বাস্তব ঘটনার চিত্রণ ও সভ্যতার ইতিহাসের ঘটনাবলীকে দেখানোর প্রয়াস হতে থাকে।

শিল্প বিশেষজ্ঞ আনন্দকুমার স্বামী জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালকে মুঘল চিত্রকলার ইতিহাসে ‘সুবর্ণ যুগ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। জাহাঙ্গীরের আমলে মুঘল চিত্রশিল্পী আত্মনির্ভর ও পরিপক্ক হয়ে ওঠে এবং ভারতীয় শিল্পীরা ইউরোপিয়ান চিত্রকলার সংস্পর্শে আসেন, আর ঠিক এই সময় থেকেই ভারতীয় চিত্রের সামনে শিল্পীর নাম লেখা শুরু হয়।
শাহজাহানের চিত্রকলার তুলনায় স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের প্রতি আগ্রহ ছিল বেশি। তার আমলে কোনো কোনো মুঘল রাজকর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে চিত্রকলার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এই সবের পরেও তাঁর রাজত্বকালকে অনেকে মুঘল চিত্রকলার “Beginning of the end” বলে উল্লেখ করেন।
আওরঙ্গজেব চিত্রকলার ঘোর বিরোধী ছিলেন, তিনি মুঘলচিত্র কারখানা (স্টুডিও) বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তৎকালীন দরবারের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করা শিল্পীরা প্রাদেশিক দরবারে আশ্রয় নেন। তাই পার্সি ব্রাউন বলেছেন, “শাহজাহানের আমলে মুঘল চিত্রকলার যে অবক্ষয় সূচিত হয়, তা আওরঙ্গজেবের সময়কালে পূর্ণতা পায়।”
তথ্যসূত্রঃ মুঘল আমল আকবর থেকে আওরঙ্গজেব (১৫৫৬ – ১৭০৭) – সমরকুমার মল্লিক, মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের ইতিহাস (দ্বিতীয় খন্ড) – অনিরুদ্ধ রায়
ছবিঃ ওল্ড ইন্ডিয়ান ফোটোস

কমেন্টস
আপনার পরিচয় জানিনা, তবে বুঝতে পারছি ভারতীয় চিত্রকলা, ভাস্কর্য আপনি চেনেন না৷ চিনলে বুঝতেন মুসলিম আক্রমনে 1000 সাল পূর্ববর্তী সমস্ত শিল্পমেধা খুন হয়ে গেছে৷ মুঘল টুঘল আমলের যা দেখাচ্ছেন এসব হাস্যকর ও শিশুতোয় মাত্র৷