গল্প কুটির ওয়েব ডেস্ক |

ভ্রমণ যে আমাদের জীবনে কতটা অপরিহার্য জায়গা জুড়ে রয়েছে তা বলাই বাহুল্য। চলতি জীবনে পেশা যখন ক্লান্তির উদ্রেক ঘটায়, ভ্রমণ নেশার হাতছানি ঠেকায় কার সাধ্য! তখনি বেরিয়ে পড়া নতুনের আস্বাদনে। পাহাড়-সমুদ্র-বালুচর তো অনেক হল! যদি চলে যাওয়া যায় প্রাচ্যের ভেনিসে! ঈশ্বরের নিজের দেশে। যেখানে দু পাশে নারকেল গাছের সারি স্বাগত জানাবে পর্যটকদের। মাঝে ব্যাক ওয়াটার বোট রাইডে প্রকৃতির সৌন্দর্য-স্নিগ্ধতা উপভোগ করতে করতে অফিসের বস্-এর রক্তচক্ষু স্মৃতিতে ভেসে এলেও, অসমাপ্ত কাজগুলোর কথা মনে পড়ে গেলেও তোয়াক্কা না করতে একপ্রকার বাধ্যই হবেন। ঈশ্বরসৃষ্ট এই পৃথিবীর এক কোণায় এত সম্ভার নিয়ে প্রকৃতি অপেক্ষা করে তা বোধহয় না গেলে অনুভব করা সম্ভব নয়। স্থানটি হয়তো এতক্ষণে বুঝেই গেছেন, কেরালা- যা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণের বিষয়। আর তার একটা অংশ হল অ্যালেপ্পি। মাত্র আট হাজার খরচে ঘুরে আসা যাবে দু-তিন দিনের জন্য।

অ্যালেপ্পি পৌঁছানোর উপায় –

রেলপথ ও আকাশপথ দুভাবেই যাওয়া সম্ভব। তবে বাজেট-ফ্রেন্ডলি ট্রিপের ক্ষেত্রে ওভার বাজেট হতে পারে আকাশপথের অপশন। তিন ঘন্টার উড়ানে কোচি বিমানবন্দরে পৌঁছে যাওয়া যায় বটে, সেক্ষেত্রে টিকিটের দাম হবে ৫০০০ হাজারের বেশি। অগত্যা রেলপথ সবচেয়ে সুবিধাজনক ও সাশ্রয়ী। প্রায় আটত্রিশ থেকে বিয়াল্লিশ ঘন্টার জার্নি, ন্যূনতম প্রায় ৫০০টাকা থেকে ৮০০টাকা খরচ, একাধিক ট্রেনের ব্যবস্থা যাত্রা করে দেয় সহজ। হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে সোজা চলে যাওয়া যাবে কন্যাকুমারী স্টেশন বা আর্নাকুলাম স্টেশনে। তারপর বাস বা ক্যাবে করে পৌঁছে যাওয়া যাবে অ্যালেপ্পি শহরে। কন্যাকুমারী স্টেশন থেকে দূরত্ব ৪৪কিলোমিটার ও আর্নাকুলাম স্টেশন থেকে ৫৭কিলোমিটার।

থাকা-খাওয়া-যাতায়াত –             

অ্যালেপ্পি শহরে থাকার জন্য সাধারণ থেকে অতি সাধারণ থেকে এলাহি সবরকম ব্যবস্থা রয়েছে। ট্রিপে এক্সট্রা অ্যাডভেঞ্চার অ্যাড করতে হলে বোট স্টে করা যেতেই পারে, তবে সেটা নিতান্তই ব্যক্তিগত নির্বাচন। কারণ এর জন্য হোটেলবাবদ ধার্য্য মূল্য স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি হবে। তা যদি প্ল্যানিং না-ও রাখা হয় মোটামুটি হাজারের হিসাবে উপযুক্ত হোটেল মিলবে অনায়াসে। সোলো ট্রিপ করার পক্ষপাতী যারা তাদের জন্য রয়েছে হোস্টেল ও ডর্মেটরির সুযোগ। অবশ্য বড় গ্রুপ বা পরিবার-এর সাথে গেলেও ডর্মেটরিতে থাকাই যায়।

স্থানীয় যে কোনো দোকানেই ভরপেট খাওয়া যাবে ১০০-১৫০টাকায়। লাঞ্চ-ডিনার সারা যেতে পারে সেখানেই। এছাড়া সমুদ্রসৈকতের আশেপাশে টাটকা মাছের নানারকম পদের লোভ সংবরণ করা কিন্তু যায় না। ওটা বাদ পড়া মানে গ্রেট মিস ! 

যাতায়াতের জন্য রয়েছে বাস, অটো, ক্যাব-এর সুবিধা। খরচের হিসাবও যথানুক্রমিক বৃদ্ধি পাবে। বাস অপশনে খরচ সবচেয়ে কম। অটোর ক্ষেত্রে কিলোমিটার প্রতি কমবেশি ২০টাকা। ক্যাব বা ট্যাক্সি সেখানে আরও কিছুটা বেশি।

আকর্ষণ –

অ্যালেপ্পি যার বর্তমান নাম অ্যালাপুজা দক্ষিণ ভারতের কেরালার এক শহর। অ্যালাপুজা বীচ, মারারি বীচ সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখার জন্য উপযুক্ত। আছে দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ ভেম্বানাদ হ্রদ যেখানে পাখির মেলা বসে প্রতিদিন। রয়েছে পুন্নামাদা লেক যা এক ঐতিহাসিক উৎসবের সাক্ষী থাকে প্রতিবছর। স্নেক বোট রেস্ প্রতিবছর এই হ্রদেই অনুষ্ঠিত হয় আগস্টের দ্বিতীয় শনিবারে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে ট্যুর প্ল্যানিং মনসুন সিজনে করতেই পারেন। রয়েছে উনিশ শতকের লাইটহাউস যা এখনো পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সময় খোলা। রয়েছে পাথিরামানাল আইল্যান্ড, কৃষ্ণপুরাম প্যালেস, এছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি চার্চ। 

তবে সব কিছুর মধ্যে এই শহরের মূল আকর্ষণ হল ব্যাকওয়াটার বোট রাইড। ছোট-মাঝারি শিকারা থেকে বড় নৌকা সবরকম রয়েছে। বড় নৌকায় ভাড়া কম। তবে আলাদা ছোট শিকারা ভাড়া করে নিয়ে ২-৩ ঘন্টার ওয়াটার ট্রিপ করা যেতে পারে, ঘণ্টাপ্রতি ৭০০টাকা মূল্যে। একটা শিকারায় একাধিক যাত্রী থাকলে মোট খরচ ভাগ হবে মাথাপিছু। এভাবে ঘুরে দেখতে পারেন প্রাচ্যের গ্রীসকে। চারিদিকে জল ও নানান রকমের গাছ, শুধুই সবুজ। শান্ত পরিবেশে জল কাটিয়ে এগিয়ে চলবে নৌকা, জলের শব্দ আসবে কানে। চোখের সামনে আসবে একের পর এক নতুন দৃশ্য।

ভ্রমণের উপযুক্ত সময়- ১. পিক সিজন – সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ

                                   ২. অফ সিজন – এপ্রিল থেকে মে

                                   ৩. মনসুন সিজন – জুন থেকে অক্টবর

প্রথমটি অ্যালেপ্পি যাওয়ার উপযুক্ত সময় কারণ আবহাওয়া তখন থাকে মনোরম। তবে মনসুন সিজনকে আয়ুর্বেদ সিজনও বলা হয়, এই সময় গেলে প্রকৃতির সৌন্দর্য অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। এই সময়ে অনেকরকম আয়ুর্বেদ ট্রিটমেন্ট হয়ে থাকে। আর পর্যটকদের ভিড় এড়াতে চাইলে অফ সিজনেও রওনা হতেই পারেন। গরম ও আর্দ্রতার সমস্যা একটু থাকলেও নির্জনে নিরালায় প্রকৃতিকে উপভোগ করতে পারবেন।

আট থেকে দশ হাজার খরচেই দু-তিন দিনের ব্রেক নিয়ে অ্যালেপ্পি ভ্রমণ কিন্তু মন্দ সিদ্ধান্ত নয়।