লেখক – শুভজিৎ দে|

সৌরভ গাঙ্গুলী অবশ্য বলেছিলেন “সারা পৃথিবীতে বিরিয়ানি খেয়েছি, তবে তাতে কলকাতাকে পাইনি।” পাবেই বা কী করে সেখানে যে আলু নেই, আর বিরিয়ানিতে কীভাবে এল আলু? সে প্রশ্ন এলে অবশ্যই মেটিয়াবুরুজের নবাব এর নাম আসবে।

অওয়াধি বিরিয়ানি আর কলকাতার বিরিয়ানি’র মধ্যে তফাৎ একটাই৷ আর তা হল আলুর ব্যবহার৷ ওয়াজিদ আলি শাহ যখন কলকাতায় আসেন, তখন তাঁর কাছে তেমন অর্থ ছিল না৷ তবে নবাবিয়ানাটা তো রক্তে৷ তিনি ছিলেন, “খানে কা অউর খিলানে কা শওখিন”৷ খেতে এবং খাওয়াতে দারুণ পছন্দ করতেন তিনি৷ কলকাতায় আসার বেশ কিছু বছর পর বিরিয়ানিতে আলুর যোগ করেন নবাব৷

শোনা যায়, সে সময় আলুর দাম ছিল আনেক বেশি। পর্তুগিজরা প্রথম এ দেশে আলু নিয়ে আসে৷ অপরদিকে মাংসের দাম এত বেশি! বিপুল পরিমাণে মাংস কিনে বিরিয়ানি তৈরি করার ব্যয়ভারটা কিন্তু সামাল দেওয়া যাচ্ছিল না কিছুতেই৷ সেই কারণে কিছুটা খরচ কমানোর পাশাপাশি বিরিয়ানির পরিমাণ বাড়াতে আলুর ব্যবহার শুরু হয়৷

ওয়াজিদ আলি শাহ’র সেই বিরিয়ানির ধারা এখনও বয়ে নিয়ে চলেছেন ওয়াজিদ আলি শাহ’র প্রপৌত্রী মনজিলাত ফতিমা৷ এখনও আলুর সহযোগে বিরিয়ানিকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি৷ নবাবি রেস্তোরাঁর সেই ধারা আর রান্নার প্রতি অমোঘ ভালোবাসা প্রতিটি বিরিয়ানির হাঁড়িতে ঢেলে দেন ওয়াজিদ আলি শাহ’র প্রপৌত্রী৷ প্রতিবার বিরিয়ানির হাঁড়ি চাপানোর আগে উচ্চারিত হয়, ‘বিশমিল্লাহ’৷ আল্লাহ’র নাম নিয়ে শুরু হয় রান্না৷ হাতের জাদুতে শুরু হয় বিরিয়ানি তৈরি৷ সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দম-এ বিরিয়ানি তৈরি৷ দম-এ বিরিয়ানি তৈরি হওয়ার সময় নিজে তো কোনও কথা বলেনই না৷ কাউকে কথা বলতেও দেন না মনজিলাত৷ এক্কেবারে বংশের সেই রীতি মেনে, হেঁসেলে চলে রান্না৷ ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতায় লাজবাব রূপ নেয় ‘কলকাতার বিরিয়ানি’৷ হাঁড়ির ঢাকনা খুলতেই বিরিয়ানির সুবাসে ম ম করে ওঠে চারপাশ ৷

এই ওয়াজিদ আলির জন্যই কলকাতার বিরিয়ানির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। তাঁর রসনা তৃপ্তির জন্যই এ শহরে ‘দমপোখ্‌ত’ বা ঢিমে আঁচে রান্না শুরু হয়। অনেকে বলেন, বিরিয়ানিতে আলুর প্রচলন নাকি ওয়াজিদ আলি শাহই করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে বিতর্কও রয়েছে। কিন্তু সেই বিতর্কের ধার ধারে না কলকাতার ভোজন রসিক মানুষজন। বিরিয়ানির স্বাদ ও গন্ধকে অনেক আগেই এই শহরের মানুষ আপন করে নিয়েছে। বিরিয়ানির ইতিহাস নিয়ে এখন আর তাঁরা মাথা ঘামাতে চান না। ইদানীং, বিরিয়ানির প্রতি বাঙালিদের টান যেন দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। শহরের রাস্তাঘাটের আনাচে কানাচে, অলিতে গলিতে এখন বিরিয়ানির রমরমা। দোকানের একশো মিটারের মধ্যে এসে পড়লেই নাকে বিরিয়ানির গন্ধ আর লাল কাপড়ে মোড়া বিরিয়ানির বিশাল হাঁড়ি চোখে পড়তে বাধ্য। পেটে সামান্য জায়গা খালি রয়েছে, অথচ অবলীলায় বিরিয়ানির দোকান পেরিয়ে চলে যাচ্ছেন… এমন সাধ্য কার আছে!

দেখতে গেলে বাঙালির প্রিয় ‘দমপোখ্‌ত’ বা ঢিমে আঁচে রান্না তিনিই নিয়ে আসেন কলকাতায়, বিশেষ করে বিরিয়ানি। বিরিয়ানিতে আলুর প্রচলনও তাঁর হাতেই কি না, তা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। তবে কলকাতার বিরিয়ানি’র সঙ্গে ভিন রাজ্যের বিরিয়ানির বহু ফারাক রয়েছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷ উপরে ছড়ানো বেরেস্তা ৷ লম্বা লম্বা সুগন্ধি চালের কোলে কাইয়ে মাখামাখি তুলতুলে খাসি ৷ আর মোলায়েম আলুর আদর ৷ সঙ্গে দেখা মেলে মুক্তোর মতো চকচকে সেদ্ধ ডিমের ৷ এমনটা তো কলকাতা ছাড়া দেখা মেলাভার! বিরিয়ানিতে হাল্কা গন্ধওয়ালা হলদেটে আলু আর ধবধবে সাদা ডিমের উপস্থিতি ছিল না প্রথম থেকে ৷ যেটা দেখা যায় কলকাতার বিরিয়ানিতে ৷ এর প্রচলনটাও কিন্তু ভারী অদ্ভুতভাবে শুরু করেছিলেন নবাব ৷