লেখক – আদিত্য গুপ্ত |

এর আগে আমরা কলকাতার বুকে নরবলির ভয়ঙ্কর ইতিহাস নিয়ে কথা বলেছি। উনবিংশ শতাব্দীর পুরনো খবরের কাগজ ঘাঁটলে দেখা যায় অবিভক্ত বাংলাদেশের নানা প্রান্তেই ঘটে চলত নৃশংস নরবলি। কেবল নরবলিই নয়, সেই সময়টাই ছিল কুসংস্কারের থাবায় ছটফট করার সময়। গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, সতীদাহ, পুরীর জগন্নাথের রথের তলায় আত্মবলিদান— এমন কত ভয়াবহ বীভৎস সব কুসংস্কারের অন্ধকারের মধ্যেই রেনেসাঁর আলো জ্বলেছিল। সেই অদ্ভুত সময়টার এক নিখুঁত ডকুমেন্টেশন আমরা পাই হুতোম প্যাঁচার নকশায়। পাতা ওল্টাতে শুরু করলেই যেন চোখের সামনে এই ডিজিটাল জমানা গায়েব হয়ে গিয়ে কানের কাছে বরফ মালাই, বেলফুল বিক্রেতার সুরেলা কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়। আসুন সেই কালজয়ী গ্রন্থ থেকে একটা ঘটনার কথা বলা যাক। তার আগে একবার মহাভারত।


মহাভারতে আছে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ষোলো বছর পরে এক রাতে মহর্ষি ব্যাসদেব ভাগীরথী নদীর জলে নেমে মৃত যোদ্ধাদের আহ্বান করেছিলেন। এক রাতের জন্যে আবার ফিরে এসেছিলেন ভীষ্ম, দ্রোণ, অভিমন্যু, ঘটোৎকচ, কর্ণ, শকুনি, দুর্যোধন, দুঃশাসন সহ সমস্ত মৃত যোদ্ধারা। তাঁদের জন্যে নদীতীরে অপেক্ষা করছিলেন তাঁদের প্রিয়জনেরা। এক অলৌকিক মুহূর্তে জীবিত ও মৃতেরা মিলিত হলেন। বহু বছর পর। পরে রাত শেষ হলে আবার সেই মৃত মানুষেরা ফিরে গেলেন।

কিন্তু এ তো মহাকাব্য। পাতায় পাতায় মহাজীবনের এক অনন্ত প্রকাশ। হুতোম তাঁর নকশায় সন্ধান দিচ্ছেন এই আখ্যানেরই এক উনবিংশ শতাব্দী ভার্শানের! যে ‘হুজুকে কলকাতা’-র ছবি আমরা নকশায় পাই, তারই এক জবরদস্ত উদাহরণ সেটা। যার সঙ্গে মহাভারতের এই ঘটনার আশ্চর্য মিল।

হুতোমের সেই কলকাতা শহরে একবার রটে গেল, পৃথিবীর বুকে ফিরে আসতে চলেছে মৃত মানুষের দল! চলতি কথায় ‘মরাফেরা’। নদিয়ার এক বিরাট জ্ঞানী মানুষ গণনা করে নাকি বলেছেন সামনের ১৫ কার্তিক, রবিবার, গত দশ বছরের সমস্ত মৃত মানুষ আবার তাঁদের ফেলে যাওয়া সুখ-দুঃখের জগতে পা রাখবেন। সেই গুজবের এমন জোর, যে দিনকয়েক শহরের বুকে আর কোনও আলোচনার বিষয় রইল না। সর্বত্র আলোচনা চলতে লাগল সেই আষাঢ়ে গল্পকে নিয়ে। মানুষের মধ্যে এ বিশ্বাস দৃঢ় হল, কথাটা একদম সত্যি। হাজার হোক রামশর্মা আচার্যের মতো লোক যখন বলছেন, তখন সে ঘটনা সত্যি না হয়ে যায় না। হুতোম লিখছেন, ‘‘বাঙ্গালা খবরের কাগজওয়ালারা কাগজ পুরাবার জিনিস পেলেন।… সহরের যে খানে যাই, সেই খানেই মরা ফেরবার মিছে হুজুক।’’
১৫ কার্তিক বহু মানুষ নিমতলা, কাশী মিত্রের ঘাটে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন হারিয়ে যাওয়া আপনজনদের জন্য! হুতোম জানাচ্ছেন, ‘‘বিধবা ও পুত্র ভ্রাতাহীন নির্ব্বোধ পরিবারেরা ১৫ কার্তিকের অপেক্ষা করছিলেন।’’ বলাই বাহুল্য, শেষ পর্যন্ত সেই ১৫ কার্তিক দিনটা চলে যাওয়ার পর তবে সেই হুজুগের প্রকোপ কমেছিল। এরপর আবার নতুন কোনও হুজুগের অপেক্ষা! এমনই ছিল সেই সময়টা। অন্ধকারে মোড়া।

তবে সেই অন্ধকার কি পুরোপুরি গিয়েছে? তিন দশক আগে এক স্বঘোষিত গডম্যানের মৃত্যুর পরেও তাঁর ভক্তরা ধরে নিয়েছিলেন, তিনি ফিরে আসবেন। ক্রমে পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ— সে এক হুলস্থূল কাণ্ড। খুব জানতে ইচ্ছে করে হুতোম সেই সময় থাকলে তাঁর নকশায় কেমন অনুপম বর্ণনা দিতেন।