কল্লোল মুখার্জী|

সমগ্র বিশ্বে করোনার হানা এক লহমায় বুঝিয়ে দিয়েছে প্রকৃতির কাছে আমরা ঠিক কতটা দুর্বল। এরপর গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো আমাদের রাজ‍্যে আঘাত হেনেছে আমফান। যা দুর্ভাগা মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেয়ে রয়েছে কিছু ছবি। দানের ছবি, সাহায্যের ছবি। কেউ নিজের এলাকায় চাল-আলু বিতরণের ছবি পোস্ট করছেন, তো কেউ আবার সুন্দরবনের প্রত‍্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যাওয়ার ছবি পোস্ট করছেন। ছবির কমেন্ট বক্সও ভরে যাচ্ছে কখনও প্রশংসায়, কখনও আবার ‘পাবলিসিটি স্টান্ট’ রূপ বদনামে। চলুন দেখি শাস্ত্র কী বলে এই সম্পর্কে-

বাইবেলে বলা হয়েছে, ঈশ্বর হলেন প্রথম দাতা ,কারণ তিনি আমাদের বাস করার জন্য এই পৃথিবী দান করেছেন। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থেই দানধর্মের উল্লেখ রয়েছে ।বলা হয়েছে ঈশ্বর জীবের মাধ্যমেই অন্যকে সাহায্য করেন তাই জীবের দান ধর্ম তাকে প্রীত করে। শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতায় তিন রকম দানের কথা বলা হয়েছে – সাত্ত্বিক , রাজসিক , তামসিক।

সাত্ত্বিক দান-

”দাতব্যমিতি যদ্দানং দীয়তে’নুপকারিনে।

দেশে কালে চ পাত্রে চ তদ্দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম্।”

দান করতে হয়, তাই দান। এই কর্তব্যবুদ্ধিতে উপযুক্ত দেশ কাল ও পাত্র বিবেচনা করে প্রত্যুপকারে আশা না রেখে যে দান করা হয় ,তাই সাত্ত্বিক দান।

রাজসিক দান:-

“যত্তু প্রত্যুপকারার্থ‌ং ফলমুদ্দিশ্য বা পুনঃ ।

দীয়তে চ পরিক্লিষ্টং তদ্দানং রাজসং স্মৃতম্।”

অর্থাৎ প্রত্যুপকারের আশায়, স্বর্গাদি ফল কামনায় অতি কষ্টের সহিত যে দান করা হয় তা হলো রাজসিক দান।

তামসিক দান –

“অদেশকালে যদ্দানমপাত্রেভ্যশ্চ দীয়তে।

অসৎকৃতমবজ্ঞাতং তৎ তামসমুদাহৃতম্।”

অর্থাৎ অনুপযুক্ত দেশে, অনুপযুক্ত কালে এবং অনুপযুক্ত পাত্রে সৎকারশুন্য ও অবজ্ঞাসহকারে যে দান করা হয়, তা হল তামসিক দান।

সহজেই অনুমিত হয় সাত্ত্বিক দান হল শ্রেষ্ঠ দান। এই দানের তিনটি লক্ষণ হল -১. স্বর্গাদি ফলাঙ্খা না করে কর্তব্য জ্ঞানে নিষ্কাম বুদ্ধিতে দান করা। ২. প্রত্যুপকারের আশা না করে দান করা, কারণ প্রত্যুপকারের আশা থাকাতে তা প্রকৃতপক্ষে দান নয়, ব্যবসা । ৩.উপযুক্ত দেশ-কাল-পাত্রে দান করা।

প্রাচীন টিকাকারগণ দেশ অৰ্থে কুরুক্ষেত্রাদি পুণ্যক্ষেত্র, কাল অর্থে সংক্রান্তি-বাহনাদি পুণ্যকাল ও পাত্র অর্থে বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদিগকে বুঝিয়েছেন। ব্রাহ্মণগণই সমাজের প্রতিষ্ঠা তথা বর্ণাশ্রম ধর্মের ব্যবস্থা করেছিলেন, কিন্তু তারা রাজত্ব, প্রভুত্ব, কৃষি, শিল্প প্রভৃতি অর্থাগমের যাবতীয় কর্মেই অন্য জাতিকে অধিকার দিয়েছেন, নিজেরা অযাচিত দানের ওপর নির্ভর করে সামান্য গ্রাসাচ্ছাদনে সন্তুষ্ট থেকে সমাজে ধর্ম জ্ঞান বিস্তারের ভার নিয়েছেন। তাই ব্রাহ্মণ জাতি রক্ষাকল্পে শাস্ত্রের এই ব্যবস্থা যুক্তিসংগত। কিন্তু কাল পরিবর্তনে ব্রাহ্মণ জাতির ব্রাহ্মণত্ব বা তীর্থক্ষেত্রাদির স্থান- মাহাত্ম্য লোপ পেলে এই সকল বিধি ব্যবস্থার কোন মূল্য থাকে না। তাই এই সকল ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুসারে কর্তব্যাকর্তব্য নির্ণয় করাই হল শ্রেয়। কারণ প্রাণহীন অনুষ্ঠান করলে অধোগতি সুনিশ্চিত। সেক্ষেত্রে যে গ্রামে পানীয় জলের অভাব, সেখানে পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হলো দেশ বিচার, মহামারীর প্রাদুর্ভাবমাত্রই ঔষধ, পণ্য দানের ব্যবস্থা করা বিধেয়, তার আগে বা পরে দান নিষ্ফল। এটি হলো কালবিচার । যার প্রয়োজন তাকে দান করা কর্তব্য, অর্থশালীকে দান করা নিষ্ফল, এটি হল পাত্র বিচার।

প্রকৃতপক্ষে শাস্ত্রে কোন অনুদারতা নেই। শাস্ত্রের মর্ম বোঝার ত্রুটিতেই আমাদের দুর্দশা। সর্বভূতের রক্ষাই, শাস্ত্রের অনুশাসন। তাই যত ইচ্ছা দান করুন। তবে কর্তব্য মনে করে দান করুন, প্রচার পেতে নয়।

তথ্য সূত্রঃ শ্রীগীতা, শ্রী জগদীশচন্দ্র ঘোষ

ছবি ঋণঃ পিক্সাবে