গল্প কুটির ওয়েব ডেস্ক।

করোনা ভাইরাসের করাল গ্রাস ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। শেষ পাওয়া খবর অনুসারে নোভেল করোনা ভাইরাস তথা COVID-19-এর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন বিশ্বের প্রায় ১,২১,৫৬৪ জন। ভারতে ১৭ মার্চ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৩০ জন। সারা দেশ করোনা ত্রাসে কম্পিত। কিন্তু এই প্রথম নয় এর আগে সারা বিশ্ব জুড়ে এমন বহু মনুষ্যসৃষ্ট রোগ এসেছে, যার অস্তিত্ব হয়তো আজ আর নেই কিন্তু একসময় সেসব রোগ সারা বিশ্ববাসীর কাছে বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। এক ঝলকে দেখে নিন প্রাচীনকালে ঘটে যাওয়া সেইসব মহামারির গল্প-

১) দ্য জাস্টিনিয়ান প্লেগ (৫৪০ খ্রীষ্টাব্দ)- ৫৪০ খ্রীষ্টাব্দে মিশরে এক ভয়ানক প্লেগের উৎপত্তি হয়েছিল। ইঁদুরের কারণেই এই রোগ বংশবিস্তার করেছিল। সেইসময়ে মিশরের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্যশস্যে সরবরাহ করত। যার ফলে রোগ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রথম এই রোগ প্রথম আক্রমণ করেছিল বাইজেন্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে। জানা যায়, এই রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারাতেন!

২) সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম বা সার্স (সাল ২০০২-২০০৪)- চিনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রোগ মহামারির আকার ধারণ করেছিল। তার মধ্যে অন্যতম হল অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম। ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে চিনের ফোশন শহর থেকে উৎপত্তি হয়েছিল এই রোগের। পরের বছরে তা প্রায় ২৬টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল প্রায় ৮০০০ মানুষ। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন প্রায় ৭৭৪ জন। পুরোপুরি অজানা একেবারে নতুন এই রোগে কার্যত আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল সারা বিশ্বে। তবে আন্তর্জাতিক স্তরে চিকিৎসা ব্যবস্থা বিস্তারের ফলে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে এসেছিল এই রোগ।

৩) বুবোনিক প্লেগ (সাল ১৩৪৬-১৩৫৩)- মূলত ইঁদুর এবং মাছির মাধ্যমে ছড়ায় এই অসুখ, যা ব্ল্যাক ডেথ নামেও পরিচিত। এই রোগে সমগ্র এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইওরোপ জুড়ে ৭৫-২০০ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল। এই রোগে সারা শরীরে ক্ষত তৈরি হয়। ত্বকের রঙ কালো হয়ে যায় এবং যৌনাঙ্গেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়ে থাকে। এর পরে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোতে থাকে মানুষ।

৪) দ্য ফ্লু মহামারি (সাল ১৯১৮-১৯২০)- মানবদেহে সব ধরণের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা। এতে আক্রান্ত হয়েছিলেন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন (মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ) মানুষ সংক্রামিত হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ২০-৫০ মিলিয়ন মানুষ। সবথেকে অবাক করা বিষয় স্বাস্থ্যবান তরুণরা এর দ্বারা বেশি আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে দুর্বল মানুষরা সুস্থ ছিলেন!

৫) জিকা ভাইরাস (সাল ২০১৫-২০১৬)- ব্রাজিল থেকে উদ্ভুত জিকা ভাইরাসের বাহক হল মশা। এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকায়। এই রোগের এর লক্ষণ হল গায়ে ফুসকুড়ি, ব্যথা, জ্বর। ২০১৫ সালে ব্রাজিলে ২৪০০ শিশু মাইক্রোসেফিলিতে আক্রান্ত ছিল। ২৯ জনের মৃত্যুও হয়েছিল। এই রোগ ছোট শিশুদের শরীরে মাইক্রোসেফিলি সৃষ্টি করেছিল যা খুবই ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনকও বটে। কারণ এই ভাইরাসের ফলে মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল।

৬) ইবোলা ভাইরাস (২০১৩ থেকে আজও)- ২০১৩ সালে পশ্চিম আফ্রিকার গিনিতে ইবোলা ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছিল। এরপর তা ধীরে ধীরে লাইবেরিয়া এবং সিয়েরা লিওনে ছড়িয়ে পড়ে। ভয়াবহ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল প্রায় ৬০% মানুষ। এমনকি ২০১৬ সালেও ২৮,৬৪৬ জন মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং মৃত্যু হয়েছিল ১১,৩২৩ মানুষ। ইবোলা কঙ্গো ও উগান্ডা গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রকেও আক্রমণ করেছিল এবং এতে ২২০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন।

৭) এশিয়ান ফ্লু (সাল ১৯৬-১৯৫৮)- এই ভাইরাস এইচ২এন২ সাবটাইপের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ নামে পরিচিত। এই রোগে ২ মিলিয়ন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। এটি প্রথমে চিন উৎপত্তি হয়েছিল, তারপর একে একে  হংকং, সিঙ্গাপুর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছিল। দ্রুত ভ্যাকসিন দান এবং অ্যান্টিবায়োটিকের সহজলভ্যতা মহামারির বিস্তার রুখতে অনেকটাই সাহায্য করেছিল।

৮) দ্য থার্ড কলেরা (১৮৫২-১৮৬০)- শতাব্দী প্রাচীন এই রোগ একসময়ে বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। এই রোগ যে কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা বুঝতে প্রায় যুগ যুগ সময় লেগে গিয়েছিল। পরে নিশ্চিত করা হয় যে এটি জল দ্বারা বাহিত রোগ। তৃতীয় মহামারিটি উৎপত্তি হয়েছিল ভারতে। তারপর তা গঙ্গা নদীর মধ্যে দিয়ে বাহিত হয়ে এশিয়া, ইওরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং আফ্রিকায় পৌঁছে গিয়েছিল। এর ফলে প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় ১ মিলিয়ন মানুষ।