শুভজিৎ দে|

নেপোলিয়ান বোনাপার্টের একটা বিখ্যাত উক্তি আছে, “Able was I ere I saw Elba”। এই বাক্যটি পিছন থেকে পড়লেও একই বাক্য হবে। ঠিক যেমন আজকের দিনটি ০২-০২-২০২০। এটাই হল প্যালিনড্রোম। অর্থাৎ কোনও বাক্য শুরু থেকে পড়লে যা হবে, তার শেষ থেকে পড়লেও একই হবে।  

ইংরেজি প্যালিনড্রোম (Palindrome) শব্দের উৎপত্তি দুটো গ্রিক শব্দ ‘প্যালিন’ (Palin) এবং ‘ড্রোমোস’ (Dromos) থেকে। যার অর্থ যথাক্রমে ‘পিছন’ ও ‘দিক’। যদিও গ্রিকদের কাছে এই রকম শব্দ ‘কারকিনিকে এপিগ্রাফে’ অর্থাৎ ‘কাঁকড়া’ শব্দ নামে পরিচিত ছিল।

বাংলায় অর্থপূর্ণ প্যালিনড্রোমিক বাক্য গঠন করা বেশ কষ্টসাধ্য। তবুও সরল কিছু শব্দ সহযোগে ছোট ছোট প্যালিনড্রোমিক বাক্য গঠন করা যায়। যেমন, বই চাইব, তুমি কি মিতু?, বিকল্প কবি, ঘুরবে রঘু, সিমার মাসি, ইভার ভাই, নাম লেখালেম না ইত্যাদি হল প্রচলিত প্যালিনড্রোমিক ছোট বাক্য।

অপরদিকে বাংলায় প্যালিনড্রোম নিয়ে লিখলে দাদাঠাকুরকে বাদ দিয়ে আলোচনা করা অসম্ভব। আর দাদাঠাকুরকে বাঙালি পাঠকরা চেনে না, এমন কাউকে মনে হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিতই প্রথম বাঙালি, যিনি বাংলায় প্যালিনড্রোম নিয়ে গভীর ভাবে চর্চা করেছিলেন। দাদাঠাকুর সম্পাদিত ‘বিদূষক’ পত্রিকায় তিনি অনেক বাংলা প্যালিনড্রোম বাক্য বাঙালিদের উপহার দিয়েছেন। যেমন – চেনা সে ছেলে বলেছে সে নাচে, তাল বনে নেব লতা, মার কথা থাক রমা, রমা তো মামা তোমার, চার সের চা, বেনে তেল সলতে নেবে, ক্ষীর রস সর রক্ষী, কেবল ভুল বকে, দাস কোথা থাকো সদা?, নিমাই খসে সেখ ইমানি, থাক রবি কবির কথা, বিরহে রাধা নয়ন ধারা হেরবি ইত্যাদি হল দাদাঠাকুর সৃষ্ট অমর কিছু প্যালিনড্রোম। এছাড়াও তাঁর লেখা প্যালিন্ড্রোম বাক্যের কবিতা হল

“রাধা নাচে অচেনা ধারা

রাজন্যগণ তরঙ্গরত, নগণ্য জরা

কীলক-সঙ্গ নয়নঙ্গ সকল কী?

কীর্তন মঞ্চ পরে পঞ্চম নর্তকী”

দাদাঠাকুরের লেখা এই কবিতার প্রতিটি লাইনই এক একটি প্যালিনড্রোম। আর শেষ লাইনটি সম্ভবত বাংলায় সৃষ্ট সবচেয়ে জটিল প্যালিনড্রোম।

শেষে আর একটা বিস্ময়কর তথ্য জানাই। দাদাঠাকুরের জন্ম ইংরেজির ১৮৮১ সালে। সালটা কিন্তু একটা প্যালিনড্রোমিক বছর। আর জন্ম তারিখ বাংলায় ১৩ বৈশাখ (১২৮৮ বঙ্গাব্দ)। ১৩ বৈশাখ সংখ্যায় লিখলে এভাবে লেখা হয় – ১৩/১। এটাও একটা প্যালিনড্রোম। আরও তাজ্জবের বিষয় হল দাদাঠাকুরের প্রয়াণ তারিখও জন্ম তারিখেই অর্থাৎ ১৩ বৈশাখ। জীবন শুরু যে তারিখ দিয়ে, মৃত্যুও সেই তারিখে। দাদাঠাকুরের জীবৎকালও একটা প্যালিনড্রোম বটে!