আদিত্য গুপ্ত|
গোটা পৃথিবী কাঁপছে করোনা ভাইরাস আতঙ্কে। চিন থেকে
ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস ক্রমেই যেন নিচ্ছে মহামারীর আকার। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ হয়ে
ইউরোপ, আমেরিকাতেও থাবা বসাতে শুরু করেছে করোনা ভাইরাস। ‘হু’ এরই মধ্যে মানুষকে
সচেতন করতে স্বাস্থ্যবিধি পেশ করেছে। এই মহা-আতঙ্কের আবহে ঘুরপাক খাচ্ছে অন্য একটা
প্রশ্নও। কোথা থেকে এল এই ভাইরাস? এর জন্ম কি গবেষণাগারে?
ওয়াশিংটন
পোস্টের দাবি সেরকমই। আসলে ভাইরাস নিয়ে গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে চিনের সবচেয়ে উন্নত
প্রযুক্তির গবেষণাগারের নাম উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি। হ্যাঁ, উহান। সেখান
থেকেই তো ছড়িয়েছে এই অসুখ। তাহলে কি ওই গবেষণাগার থেকেই কোনও ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে
মারণ ভাইরাস? সন্দেহ ক্রমেই দানা বাঁধছে। ইজরায়েলের দাবি, চিন চায় জীবাণু অস্ত্রের
সাহায্যে বিশ্বের তাবড় দেশগুলিকেও চাপে রাখতে। আর সেই পরিকল্পনাতেই ওই ধরনের
গবেষণাগারে চলছে নিরন্তর গবেষণা। কিন্তু অসাবধানতাবশত সেখান থেকে ভাইরাস যে মিশে
যাবে উহানের বাতাসে, আর শুরু করবে মৃত্যুলীলা, তা চিন ভাবতেই পারেনি।
অসাবধানতা?
নাকি অন্তর্ঘাত? গবেষণাগারের কোনও বিজ্ঞানীই এই কাজ করেননি তো? বাতাসে নানা জল্পনা
ভেসে বেড়াচ্ছে ওই জীবাণুদের মতোই।
যাই
হোক, আমরা এই কলামে ইতিহাসের কথা বলি। তাই সেই নিয়ম মেনে সময়ের মুখ একটু পিছন দিকে
ঘোরানো যাক। এই জীবাণু যুদ্ধ ব্যাপারটা কিন্তু নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়
স্কটল্যান্ডের গ্রুইনার্ড দ্বীপে পরীক্ষা চালানো হয় বিপজ্জনক অ্যানখ্রাস্ক
জীবাণুদের নিয়ে। তারও আগে ১৯৩০ সালে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়াতেও একটি দ্বীপে জীবাণু
অস্ত্র নিয়ে গবেষণা চলে। ফলস্বরূপ সেই দ্বীপ দুটি কিন্তু হয়ে পড়ে মানুষের বসবাসের
অযোগ্য। গবেষকের দল শেষ পর্যন্ত প্রাণের মায়ায় চম্পট দেন সেখান থেকে। ফলে বোঝাই
যাচ্ছে, ব্যাপারটা নতুন নয়। শুনলে অবাক হবেন, আরও বহু পিছন দিকে হাঁটলেও এমন খবর
মিলবে!
আজ
থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগেও এমন ফন্দির সন্ধান মেলে! শোনা যায়, হিত্তিত নামের এক
যোদ্ধা জাতির মধ্যে এর প্রচলন ছিল। ভেড়ার শরীরে রোগের বীজ বুনে তাকে ছেড়ে আসা হত
শত্রুনগরীতে। তারপর সেই ভেড়া পেয়ে অন্যরা তাদের পালন করতে থাকার সময় ক্রমে সেই
জীবাণুতেই শয়ে শয়ে মানুষ মরত। সুদূর সময়ের মৃত্যুমিছিলের সেই ইতিহাস আজকের এই
জীবাণু যুদ্ধের এক অতীত-ছায়া হয়ে রয়ে গিয়েছে পুরনো পৃথিবীর গর্ভে।
এবার
একটু ভবিষ্যতের কথা ভাবি। আর সেটা অতীতের ছায়ার দিকে দেখতে দেখতেই। শেষ পর্যন্ত
করোনা ভাইরাসকে রোখা যাবে কিনা সেটা পরের কথা। ইতিহাস কিন্তু বলছে এমন মহামারী
মোটেই বিরল কিছু নয়। কেবল প্লেগ অসুখটাই বারে বারে হানা দিয়ে মহামারী ঘটিয়ে কোটি
কোটি মানুষ মেরেছে। সেই কবে যিশুর জন্মের ৫৪১ বছর আগে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও
ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় মারা যান ১০ কোটি মানুষ! মহামারী চলেছিল প্রায় দুই শতাব্দী
ধরে। অনেক পরে ১৩৩৪ সালে আবারও ফেরে প্লেগ। ইতিহাসে যা কুখ্যাত ‘গ্রেট প্লেগ অফ
লন্ডন’। সেবার ইউরোপে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ মারা গিয়েছিলেন প্লেগে। পরে ১৩৪৬ সালে
এশিয়ায় হয় ‘দ্য ব্ল্যাক প্লেগ’। মৃত্যু হয় ৫ কোটি মানুষের। এরপর ১৮৬০ সালে আবার
ফিরে আসে প্লেগ ও মহামারী। হাতে হাত ধরে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন আগামী দু’-তিন দশকের মধ্যে
ডেঙ্গু থেকেও হতে পারে মহামারী! অর্থাৎ যত সময় বাড়ছে পৃথিবী নানা কারণে বিপন্ন হয়ে
পড়ছে এমনিতেই। এই পরিস্থিতিতে করোনা ভাইরাসদের ঘিরে মহামারীর কালো আতঙ্ক ক্রমেই
বাড়ছে পৃথিবী জুড়ে।
শেষ পর্যন্ত কী হবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন। সেই সঙ্গে চেষ্টা করা হচ্ছে আক্রান্তকে সাবধানে রাখতে, যাতে সহজে না সংক্রমণ ছড়ায়। যাদের চোখে দেখাও যায় না, তারাই কাঁপিয়ে দিচ্ছে সভ্যতার হৃদয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের হার নিশ্চিত। জিতবে মানুষই। ইতিহাসের হলুদ হয়ে যাওয়া পাতা আমাদের সেই ভরসাই দিচ্ছে।
