শুভজিৎ দে|
মহম্মদ সিরাজুল ইসলামের পতিতাবৃত্তির কারন ও পতিকার গ্রন্থে পাওয়া যায়, সভ্যতার যাত্রাপথে বহু বহু বছর পরে ভারতে বৈদিক যুগে পতিতাবৃত্তি ছিল বলে কোনওকোনও অনির্ভরযোগ্য প্রাচীন পুস্তক। অবশ্য এধরনের পতিতাবৃত্তি বর্তমান যুগের মতো নয়। রাজদরবারে গণিকা ছাড়াও মন্দিরে দেবদাসী নিয়োগের কথা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায়। দেবদাসী প্রথাটি ধর্মীয় ভিত্তিতে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করায় সুন্দরী যুবতীদের কেনাবেচা আইনানুগ হয়। তখন থেকেই সুযোগ সন্ধানীরা এই প্রথার সুযোগ নিয়ে ব্যাভিচার শুরু করে। তৎকালীন ভারতীয় সমাজে নোংরা আচার-আচরন ব্যবস্থার কারনে নারীজাতি অবদমিত, নিপীড়িত, লাঞ্ছিত ও ভোগের স্বীকার হয় বিভিন্নভাবে নানা নিয়ম-নিষ্ঠার নাগপাশে। এর পর অবশেষে তাদের ছুড়ে ফেলে দেওয়া হত; চিবিয়ে ফেলে দেওয়া চুইংগামের মতো। অগত্যা তখন তাদের বেশ্যাবৃত্তি ছাড়া কোনও গতি থাকতো না। দক্ষিণ ভারতে এই প্রথা এত জনপ্রিয় ছিল যে, মোক্ষ ও অর্থ লাভের আশায় কেউ কেউ বাইরে থেকে মেয়ে কিনে এনে, অথবা কেউ নিজের কন্যাকে পর্যন্ত মন্দিরে উৎসর্গ করত। রাজপুরুষ ও মন্দিরের উচ্চশ্রেনীর পুরোহিতরা এই নারীদেহ ভোগ করত। রাজপুরুষ ও মন্দিরের উচ্চশ্রেনীর পুরোহিতরা এই নারীদেহ ভোগ করত। এই প্রথা অনেক সময় তা ধর্মীয় বিধিও পাপস্খলনের জন্যও হয়ে থাকত। যার সঙ্গে স্বভাবগত মিল পাওয়া যায় ১৫ শতকের ইউরোপে প্রাক নবজাগরন মুহূর্তে চার্চের ধর্মীয় পাত্রবিলির মত। এই সব দেবদাসীদের জন্য ভালোবাসা বা বিয়ে ছিল মৃত্যু তুল্য অপরাধ, মন্দির থেকে একবার এরা বহিষ্কৃত হলে পতিতালয় ছাড়া এদের আর কোথাও জায়গা হত না।
শুনলে অবাক লাগে সে সময় মানুষ কিনা কাজ করেছে, তাও সভ্যতার জন্য নাকি ভোগবিলাসিতের জন্য। এই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে বারবার। অমরকোষ গ্রন্থে জয়াজীব বলে এক শ্রেনীর লোকের উল্লেখ পাওয়া যায়, যে সমাজে পয়সার বিনিময় একজনের স্ত্রীকে অনেকে ভোগ করত। রামায়নে আছে, রাম বনবাসে যাওয়ার সময় সীতা সঙ্গে যাওয়ার জন্য জেদ ধরেন, রাম প্রথমে তাকে নিয়ে যেতে অস্বীকার করলে তিনি বলেন “নর্তকেরা যেমন তাদের স্ত্রীদের অন্যভোগ্যা করে, তুমিও আমাকে তাই করতে চাও?” –এখান থেকে চিন্তা করলে অন্যভোগ্যা শব্দটি সম্পর্কে একটি ধারনা জন্মাবে। “বাৎসায়নের কামসূত্রে” চারন কবি সম্প্রদায়ের উল্লেখ করে বলা হয়েছে চারনদের স্ত্রী সহজলভ্যা ছিল।
পৌরানিক কাহিনি ও শাস্ত্রগুলো থেকে আরও জানা যায় ‘রাজবাড়ির উৎসবের দিন সিংহ দরজা খুলে দেওয়া হত। বহু রমনী আসত সেখানে, অনেকে কাজে আবার অনেকে উৎসব দেখতে। রাজা তাদেরকে দূর থেকে দেখে পছন্দ করতেন এবং দূত মারফত উপঢৌকনসহ তাকে রাজার শয্যাশায়িনি হবার জন্য আমন্ত্রন পাঠাতেন। স্বেচ্ছায় না এলে, তাকে বলপূর্বক নিয়ে এসে রাজপালঙ্কে ফেলা হত। এক্ষেত্রে তার পরিবার বা স্বামী কিছু বলতে পারতেন না। রাজার দেখা দেখি অমর্ত্যবর্গের কাছেও যে সকল রমনী কাজে আসত, তাদেরকে এইসব উচ্চপদস্থ রাজ কর্মচারীর যৌন সম্ভোগের শিকার হতে হতো। কামসূত্রে আরও উল্লেখ আছে বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, প্রাষিত ভর্তৃকা (যার স্বামী থাকেন) অক্ষমের স্ত্রী ও বাড়ির দাসীকে পুরুষেরা বিভিন্নভাবে ফুসলিয়ে জোর করে ভোগ করতো। যদিও এই সব যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে আইন ছিল না। বৈদিকোত্তর যুগের চিত্র তুলে ধরেছেন এল. ডি. যোশী, নৈনিতাল আলমোড়া এবং গাড়োয়াল অঞ্চলে দেশীয় রাজাদের অধীনে ‘নাইক’ –নামে এক সম্প্রদায় ছিল। নাইকদের মেয়েরা ঘরের পুরুষদের ভরন-পোষনের জন্য বেশ্যাবৃত্তি গ্রহন করতে বাধ্য হতেন। অনেক সময় অর্থের বিনিময় পুরুষেরা ঘরের মেয়েদের বিক্রি করে দিত। পরবর্তীকালেও যে এই কর্মকান্ড বন্ধ হয়নি তা বোঝা যায় ব্রিটিশ শাসনকালে এই ধরনের কাজ বন্ধ করা হয়। তা সত্ত্বেও চিত্র পরিবর্তন হয়নি, বর্তমান দিনেও বাড়ির মেয়ে বা স্ত্রীকে সোনাগাছিতে বেঁচে দিয়ে যাওয়ার উদাহরণ পাওয়া যায়।
মিসেস গৌরি ব্যানার্জী নম্বুদ্রি সমাজের এক মর্মস্পর্শী চিত্র তুলে ধরেছেন। নম্বুদ্রি সমাজের কন্যারা থাকতো পর্দার অন্তরালে, কোনও পুরুষ যদি হঠাৎ তাদের দেখে ফেলত কিংবা স্পর্শ করতো, তবে সেই মেয়ে পতিতা বলে গন্য হত সমাজে। প্রথমে সমাজপতিরা মেয়েটিকে সমাজচ্যুত বলে ঘোষনা করে দিলে তার বাড়ির ভৃত্যরা সর্ব প্রথম মেয়েটিকে ভোগ করে রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসবে। এক্ষেত্রে মেয়েটির বাবা-মা কিছু বলতে পারবে না। পরবর্তীকালে লড়াই করে মেয়েটিকে রাস্তা থেকে যে নিয়ে যেতে পারবে মেয়েটি তার ভোগের পাত্র হবে। এভাবে কিছু হাত ঘোরার পর তাকে বিক্রী বা দান করে দেওয়া হত। অবশেষে মেয়েটি পৌঁছাতো অন্ধকার জগতে। তখন তার আত্মহত্যা বা পতিতাবৃত্তি ছাড়া সামনে কোনো উপায় থাকতো না।
ডি. এন. মজুমদার হিমালয়ের কোলে উপজাতিদের মধ্যে এক আশ্চর্য প্রথার কথা লিখেছেন, ‘রীত’ নামক এক প্রথা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি তার প্রথম স্ত্রীকে বিক্রী করে দিতো, সেই অর্থে সে স্বাচ্ছন্দে দ্বিতীয় স্ত্রী সংগ্রহ করতে পারতো এবং তাকেও সে এমনি ভাবে বেঁচে দিতে পারত। এভাবে বেঁচা-কেনার ফলে হাত বদল হতে হতে যৌবন নিঃশেষ হলে পরে তারা আস্তাকুরে নিক্ষিপ্ত হতো, স্থানীয় সরকার স্ত্রী বিক্রয়ের ওপর কর আদায় করতেন বলে জানা যায়।
মহম্মদ সিরাজুল ইসলাম লিখছেন আমাদের বাংলাতেও এক সময় ছিল এরকম এক অদ্ভূত প্রথা, রাজা লক্ষন সেন ছিলেন এই প্রথার উদ্যোক্তা। এই প্রথার নাম ছিল কুলিন প্রথা। ব্রাহ্মণ কুলিক পুরুষেরা অর্থের বিনিময়ে ঘরে ঘরে বিয়ে করে বেড়াত। কোনও কোনও কুলিন ব্রাহ্মনের শতাধিক স্ত্রী থাকবার কথা জানা যায়। অনেক যৌবনবতী স্ত্রী স্বামীর সংসর্গ না পেয়ে ব্যাভিচারে লিপ্ত হতো, এতে সে গর্ভবতী হয়ে পড়লে কুলিন স্বামী মেয়ের পিতার কাছে সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকার করার বিনিময়ে অনেক টাকা আদায় করত। অন্যথায় ব্যাভিচারের অপরাধে মেয়েটিকে সমাজচ্যুত করা হত। বিতাড়িত মেয়েটির সামনে খোলা থাকতো মাত্র দুটি পথ; আত্মহত্যা বা পতিতালয়। ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয় অর্ধ থেকে বেশ্যাবৃত্তির চরিত্রের পটপরিবর্ত্ন হতে থাকে, বর্তমান দিনে আমরা যেভাবে বেশ্যালয় বা বেশ্যাবৃত্তিকে দেখে থাকি, তার সূচনা বা ভাবনার পরিবর্তন এই সময় থেকে ঘটতে থাকে।
প্রাচীন শাস্ত্রাদি থেকে জানা যায়, এটি মোটেই আজকের মত ছিল না। বরং বেশ সন্মানজনক একটি পেশা ছিল। কিন্তু মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বে নীলধ্বজের স্ত্রী জনা, পান্ডু পত্নী বা পান্ডব দের মাতা কুন্তী, তার পুত্রবধূ অর্থাৎ দ্রৌপদী এবং হস্তিনাপুরের সম্রাট শান্তনুর দ্বিতীয় স্ত্রী সত্যবতী –কে বেশ্যা বলে মন্তব্য করেছেন, বলে জানা যায় কবি মধুসূদন দত্তের কাব্য থেকে। অতএব কেউ জন্ম থেকেই ভেবে নেয় না সে বেশ্যা হবে। সমাজ ও অর্থনৈতিক সংকট তাকে ওই পেশা গ্রহন করতে বাধ্য করে; বাধ্য করে সমাজের জটিল রীতি-নীতি।
উপরিউক্ত আলোচনার থেকে বোঝা যায়, প্রাচীনকালে পতিতারা সন্মান পেলেও বর্তমান দিনে তারা তার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, শুধু বঞ্চনাই নয়, সমাজ তাদের অপাংক্তেয় হিসেবে মনে করে। এই মনভাবের পরিবর্তন দরকার।

কমেন্টস
System changed in era of using condom and different marriage- act especially Hindu marriage act where divorce is difficult in name of religion….
খুব সুন্দর লাগলো অতীত পতিতাবৃত্তি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইতবৃত্ত..,
Well narrated story
Porte Porte choke jol ese gelo….
Mey ra ki chirikal e eirakam obohelito e theke jabe….
কৌলিন্য প্রথা চালু করেন রাজা বল্লাল সেন