গল্প কুটির ওয়েব ডেস্ক|

একটি সঠিক বায়োম আমাদের পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যার উপর নির্ভর করেই বাস্তুতন্ত্র বজায় থাকে। সেই মতো পরিবেশ থেকে কোনও প্রজাতির প্রাণী বিপন্ন হলে তা পরিবেশ ভারসাম্যহীনতার কারণ হয়ে ওঠে। কারণ একটি প্রজাতির ক্ষতি অন্য প্রজাতিগুলিকেও ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিপন্ন প্রজাতিদের রক্ষার একমাত্র উপায় হল তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান রক্ষা করা। এইভাবে, প্রাণী এবং উদ্ভিদের বিভিন্ন প্রজাতিগুলিকে একসাথে সুরক্ষিত করা সম্ভব । এই পথ অনুসরণ করেই আজ থেকে প্রায় আট বছর আগে, একটি দ্বীপ থেকে এক বিশেষ প্রজাতির কচ্ছপদের চিরতরে বিপন্ন হওয়ার মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন গবেষকরা। দ্বীপটির নাম গালাপাগোস।

গালাপাগোস দ্বীপ পিনজোনের অন্তর্গত। ওই দ্বীপের কচ্ছপগুলি প্রথমের দিকে সুস্থভাবে বেঁচে থেকে বংশবৃদ্ধি করছিল। তাদের বেঁচে থাকা নিয়ে সমস্যা দেখা দিলো অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে। শোনা যায় ওই সময় দ্বীপটিতে একটি জাহাজ এসে নোঙ্গর করেছিল। আর সেই জাহাজ থেকেই ক্ষুধার্ত ইঁদুরের দল নেমে এসে দ্বীপের কচ্ছপগুলির উপর আক্রমণ করে।

সেই রাক্ষুসে ইঁদুরগুলি কচ্ছপের ছানা সহ দৈত্যাকৃতি কচ্ছপের বহু ডিম খেয়ে ফেলেছিল। যার ফলে দ্বীপেটির বাস্তুতন্ত্র একসময় ব্যাহত হয়। ধীরে ধীরে ওই দ্বীপটিতে কচ্ছপের সংখ্যা কমতে শুরু করে। তবে বলা বাহুল্য এর জন্য মানুষের ক্রিয়াকলাপও সমানভাবে দায়ি ছিল।

তারপর প্রায় এক শতাব্দী কেটে গিয়েছিল, ওই প্রজাতির দৈত্যাকৃতি কচ্ছপ গালাপাগোসে আর দেখা যেতো না। তবে কয়েক দশক ধরে সংরক্ষণের প্রচেষ্টায় চিত্তাকর্ষক ফলাফল পাওয়া গিয়েছিল। বর্তমানে দ্বিপটিতে প্রচুর কচ্ছপ রয়েছে । এখন প্রতিটি কচ্ছপই সেখানে সুস্থভাবে জন্মগ্রহণ ও প্রজনন করছে।

২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে বায়ু-পতিত ইঁদুরের বিষ ছড়িয়ে ওই দ্বীপ থেকে ইঁদুরকুলকে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছিল। তারপর থেকেই দ্বীপটিতে কচ্ছপের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ইঁদুর নির্মূল অভিযানটি দ্বীপ সংরক্ষণ, গ্যালাপাগোস জাতীয় উদ্যান অধিদপ্তর এবং সেখানকার অন্যান্য অংশীদারদের দ্বারা সম্পন্ন হয়েছিল। দীর্ঘ এক বছর পর্যবেক্ষণের পর তারা দ্বীপটিকে ইঁদুর মুক্ত ঘোষণা করেছিলেন।

১৯৬০ সালে প্রথম, দ্বীপটি পুনরুদ্ধার করে কচ্ছপ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই সময় গবেষকরা গালাপাগোস থেকে অবশিষ্ট প্রায় একশটি ডিম সংগ্রহ করেছিল। পরে সেই ডিমগুলিকে অন্য একটি দ্বীপে রেখে আসেন তারা। পাঁচ বছর পর যখন সেই কচ্ছপগুলি নিজের আত্মরক্ষার পক্ষে যথেষ্ট সবল হয়ে ওঠে তখন তাদের পিনজোনে ফিরিয়ে আনা হয়।

কিন্তু তখনও ইঁদুরগুলি কচ্ছপের ডিম খেয়ে পুনরায় সমস্যা সৃষ্টি করে। অবশেষে ইঁদুর নির্মূল করে দ্বীপটির উন্নতি শুরু হয়েছিল। স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের ভার্টেব্রেট কনজার্ভেশন বায়োলজির অধ্যাপক এবং স্টেট ইউনিভার্সিটির এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড ফরেস্ট বায়োলজি বিভাগের সহযোগী, গবেষক জেমস গিব্বস, গ্যালাপাগোস সংরক্ষণের সাথে সেখানকার গালাপাগোস দৈত্য কচ্ছপ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগে সাহায্য করেছিলেন।

২০১৪ সালে যখন তিনি এবং তাঁর দল ওই দ্বীপে পৌঁছেছিলেন, তারা দেখেন দ্বীপের সামনের অংশে দশটি কচ্ছপ ডিম ফুটে বেরিয়ে আসছে। এটি দেখে তারা বুঝেছিলেন বাস্তুসংস্থানটি শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতিক ক্রমে ফিরেছে।

প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর সেই বিপন্নপ্রায় কচ্ছপগুলি গালাপাগোস দ্বীপে ডিম পেড়ে নতুন প্রাণের জন্ম দিয়েছিল। এখন সেই দ্বীপে কচ্ছপদের রাজত্ব চলে বলা যায়। পৃথিবীর বুকে তাদের ধরে রাখতে মানুষ যেভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ঠিক তেমনই বিশ্ব পরিবেশকে রক্ষা করতেও আমাদের সকলের এগিয়ে আসা উচিত। তাহলেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকবে। শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থের কথা ভেবে বনজঙ্গল ধ্বংস না করে, অন্যান্য প্রাণীদের বাসস্থানের কথাও ভাবা উচিত। কারণ পরিবেশের উপর সকলের সমান অধিকার রয়েছে।  

ছবিঃ পিক্সাবে ও প্রিন্টারেস্ট