ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের কাছ থেকে হয়তো ‘না’ শুনতে অভ্যস্থ নন পুরুষরা, আর সম্ভবত সেই কারণেই ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, অ্যাসিড আক্রমণের মতো ঘৃণ্য ঘটনার শিকার হতে হয় মেয়েদের। মেয়েদের হাতে অপশন বলতে দুটো- একজন পুরুষের ইচ্ছেকে মুখ বুঝে মেনে নেওয়া, অথবা নিজের জীবনে কিছু করা, বাবা-মার মুখ উজ্জ্বল করার মতো স্বপ্নকে বিসর্জন দেওয়া। কথাগুলি এক নারীবাদীর প্রেক্ষাপটে নাা দেখে একজন সাধারণ মানুষ হিসাবেও একটু তলিয়ে দেখবেন। কারণ অ্যাসিড আক্রান্ত লক্ষ্মী আগরওয়ালের স্বপ্নগুলিও এই একই কারণে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়। আর তাঁর জীবনের গল্প তুলে ধরেছেন পরিচালক মেঘনা গুলজার। ছবিতে লক্ষ্মী আগরওয়ালের জীবন সংগ্রাম ফুটিয়ে তুলেছেন দীপিকা পাডুকোন। ছবিতে তিনি মাালতী আগরওয়াল।
ছবি শুরু হয় দিল্লির নির্ভয়া গণধর্ষণকাণ্ডের প্রতিবাদের ময়দান থেকে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদীদের ভিড়ে এক অসহায় বাবা তাঁর অ্যাসিড আক্রান্ত মেয়ের কথা মিডিয়ায় তুলে ধরার আর্জি জানাচ্ছেন। পরিচালক মেঘনা গুলজার কোথাও গিয়ে একটা বিষয় স্পষ্ট করে দিলেন মেয়েদের ওপর হয়ে চলা অন্যায় পরিমাপের কোনও প্যারামিটার হয় না- ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির পাশাপাশি মেয়েদের ওপর হওয়া অ্যাসিডের হামলা নিয়ে প্রতিবাদের সময় এসেছে। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে সব চরিত্রের নামও বদলানো হয়েছে। তবে যে বিষয়টি নিয়ে উত্তাল হয়েছিল চারিদিক তা হল, অ্যাসিড হামলাকারীর ধর্ম বদলে দেওয়া হয়েছে, যা একেবারেই ঠিক নয়। আসল হামলাকারী নঈম খানের নাম হয়েছে বশির খান।
অ্যাসিডে পোড়ার ক্ষত, ঝলসানো মুখ, দলা পাকিয়ে যাওয়া নাক-ঠোঁট- যে সমাজে স্কিনটোন একটা এত বড় ফ্যাক্টর, সেখানে চেহারার এমন বীভৎসতা যে সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না তা তো খুব জানাই কথা। কিন্তু কঠিন বাস্তব এটাই এই বীভৎসতা প্রাথমিকভাবে মেনে নিতে পারেন না একজন অ্যাসিড আক্রান্তও। নিজেকে দেখে নিজেই শিউরে ওঠে প্রতি মুহূর্তে। মালতী চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে একজন অ্যাসিড আক্রান্তের তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন দীপিকা। তবে যন্ত্রণা কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কোট-কাছারি, মামলা, বছরের পর বছর ধরে আদালতের চক্কর খাওয়া, একটু সুবিচারের আশায় দিন-রাত এক করে লড়াই করার যন্ত্রণাও যে কিছু কম নয় সিনেমার পরতে পরতে ফুটে উঠেছে সেই কাহিনিও। ছবির প্রেক্ষাপট আজকের দিনের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। সাধারণ মানুষ তো বটেই সেই সঙ্গে এই হার না মানার গল্প পৌঁছে দেওয়া দরকার ছিল সেই সব অগণিত অ্যাসিড আক্রান্তদের কাছে যাঁদের লড়াই এখনও জারি। একের পর এক কঠিন সার্জারির পাশাপাশি ভাইয়ের অসুখ ও মায়ের দেখভালের জন্য চাকরি খোঁজা শুরু করেন মালতী। ইন্টারভিউ দিতে এসে যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি তাঁর অ্যাপ্লিকেশনে কোথাও বলা নেই তিনি অ্যাসিড আক্রান্ত, উত্তরে দীপিকা ওরফে মালতী বলেন, ফর্মে কোথাও অ্যাসিড আক্রান্তদের ক্যাটেগরি নেই, থাকলে তিনি অবশ্যই তাতে টিক দিতেন। পাশাপাশি পার্লারে কাজ করার সময় এক মহিলা মজা করেই তাঁকে বলেন বিউটি পার্লারে কাজ করার জন্য ‘বিউটি’ থাকাটা খুবই দরকার। অবশেষ তাঁর যোগাযোগ হয় ভিক্রান্ত মাসি ওরফে অমোল দ্বিবেদীর সঙ্গে। সাংবাদিকতার পেশা ছেড়ে যিনি অ্যাসিড আক্রান্তদের জন্য একটি এনজিও চালান। ছবিতে নিজের সেরাটা দিয়েছেন ভিক্রান্ত। অর্থের অপ্রতুলতার মধ্যে দাঁড়িয়েও অ্যাসিড আক্রান্তদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের হয়ে নিরন্তর লড়াই চালাতে চালাতে বদমেজাজী ও গম্ভীর, হাসতে ভুলে যাওয়া মানুষের চরিত্রে নিখুঁত ভিক্রান্ত। তবে মালতী আর অমোলের শীতল প্রেমের মাঝখানে অরিজিত সিং-এর গান একটা অন্য মাত্রা যোগ করেছে। তবে তা না থাকলেও তাতে ছবির কোনও ক্ষতি হত না। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি আরও একটু ভাল হতে পারত। ‘তলবার’, ‘রাজি’র পর পরিচালক মেঘনা গুলজারের কাছ থেকে আর একটু টান টান চিত্রনাট্য আশা করা হয়েছিল, তাতে খানিকটা নিরাশ করেছেন পরিচালক।
ছবির আর একটা বিরাট অংশ দখল করে রয়েছে কোর্টরুমের দৃশ্য। মালতীর আইনজীবির চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ে নজর কেড়েছেন মধুরজিত সারঘি। দীর্ঘ সাত বছর ধরে লড়াইের পর অপরাধীর দশ বছর শাস্তি এবং এক লক্ষ টাকা জরিমানা হয়। যদিও তাতে খুশি নন স্বয়ং আইনজীবি, কারণ অ্যাসিড আক্রান্তের কারণে একজন মেয়ে সারা জীবন যা বয়ে বেড়ায় তার তুলনায় এই সাজা কিছুই। কিন্তু সুপ্রিমকোর্টের এই রায় এক ঐতিহাসিক রায়, কারণ প্রথম আদালত অ্যাসিড হামলকারীর এইরকম শাস্তি ঘোষণা করেছে।তবে এই ছবি যে বার্তা দেয় তা হল, মানুষের মস্তিষ্কে যতদিন ‘অ্যাসিড’ ভরা রয়েছে, ততদিন নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মানুষ অ্যাসিড হাতে তুলে নিতে দু’বার ভাববে না।
ছবিতে মালতী আগরওয়াল সুবিচার পেলেও আরও একবার দর্শকদের নাড়িয়ে দিয়েছে ছবির শেষ দৃশ্য। অগণিত মালতীর আর্তি আজও শোনা যায় দেশের কোণা কোণা থেকে, তাই লড়াই এখানেই থেমে নেই। সাম্প্রতিককালে জেএনইউ কাণ্ডে দীপিকা পাডুকোনের ছাত্রদের পাশে থাকার প্রশ্নে ‘ছপক’ ঘিরে যে রাজনৈতিক চাপানউতোর তৈরি হয়েছিল, তা হেলায় সরিয়ে কেরিয়ারে প্রায় ২ বছরের বিরতি কাটিয়ে ফের নিজের ফর্মে ফিরেছেন দীপিকা। নিজের চেনা ছকের বাইরে বেরিয়ে দীপিকার অসামান্য অভিনয় এই ছবিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। আর সেইকারণেই এই ছবি বহু মানুষকে হলমুখী করে তুলবে।
