শুভজিৎ দে|

“ও এক দুর্ভাগ্যবান, যে পেয়েও থাকতে চায়নি এ দেশের মাটিতে সমাধিস্ত, আর আমি এক দুর্ভাগ্যবান, যে চেয়েও পাচ্ছি না দু’গজ জমি থাকার মতো” শুরু করলাম এক দুর্ভাগ্যবানের একটি কথা দিয়ে, এ কথা তিনি জীবনের শেষ সময়, নির্বাসনে থাকাকালীন জেলের দেওয়ালে লিখে গেছেন, তিনি আর কেউ নন, আজ থেকে বহু বছর আগে ভারত ইতিহাসে যিনি নতুন যুগের সূচনা করেন, সেই মির্জা জহিরউদ্দিন মহম্মদ বাবর এর উত্তর পুরুষ, শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর, যার শাসন শেষ হবার মাধ্যমে ৩৩১ বছরের ঐতিহ্য অস্তমিত হয়। হঠাৎ কেন আজ মুঘলদের কথা বলছি, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, আদতে আজ থেকে ৪৯৪ বছর আগে এই ভারতের মাটিতে শুরু হয়েছিল মুঘল সাম্রাজ্যের ইমারত পানিপথের প্রথম যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে, আজ ফিরে দেখা সেই যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস।

ঐতিহাসিক এই পানিপথে তিনবার যুদ্ধ হয়। প্রথম যুদ্ধ হয়েছিল ১৫২৬ সালে, দ্বিতীয়টি ১৫৫৬ ও তৃতীয়টি ১৭৬১ সালে। পানিপথের প্রথম যুদ্ধে জাহিরউদ্দিন বাবর দিল্লির আফগান সুলতান ইব্রাহিম লোদীকে পরাস্ত করে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। অবসান ঘটান ভারতে লোদী বংশের শাসনকালের, দিনটি ছিল ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল, কয়েক ঘন্টার এই যুদ্ধে নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল ভারতের অদূর ভবিতব্য।

উত্তর ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের বর্তমানে একটি জেলা শহর হল পানিপথ। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। বর্তমানে পানিপথ প্রসিদ্ধ ভারতের বয়নশিল্প শহর হিসেবে। ভগবত গীতায়ও পানিপথের উল্লেখ আছে ‘ধর্মক্ষেত্র’ নামে।

ভারতের শাসকগণ বারুদের ব্যবহার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে কামানের ব্যবহার সম্পর্কে তারা অজ্ঞাত ছিল, ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের পানিপথ গ্রামের নিকটে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধের স্থান নির্বাচন করেন বাবর নিজে, তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যভাগে তিনি এক বিশাল গভীর পরিখা খনন করেন, এবং তার দুই দিকে অশ্বারোহী বাহিনী যাওয়ার জন্য অল্প জায়গা রাখেন, এই গভীর পরিখা কাটেন যাতে বিপক্ষের হস্তিবাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করা যায় এবং পিরিখার পিছনে দড়ি দিয়ে বাঁধা প্রায় ৭০০টি গরুর গাড়ি রাখেন, ওই গাড়িগুলির মাঝখানে ফাঁক ছিল যেখানে ছোটো ইটের কাজ করে বন্দুকধারিদের রক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, এই সারির পিছনে তৈমুরের প্রণালী অনুযায়ী সৈন্য সাজানো হয়েছিল, যার সঙ্গে ছিল উজবেগ ধরনের ছড়ানো ছিটানো গতিশীল অশ্বারোহী।

বলা হয় যে, ইব্রাহিম লোদীর এক লক্ষ সৈন্য ছিল; সম্ভবত যুদ্ধ করার মতো সৈন্য ছিল পঞ্চাশ হাজার, সঙ্গে ছিল দু’হাজার হাতি যারা অবশ্য গোলাগুলির সঙ্গে পরিচিত ছিল না। এক সপ্তাহ মুখোমুখি দাঁড়ানোর পর, ইব্রাহিম ২১ এপ্রিল ১৫২৬ সালে আক্রমণ করেন, আফগান অশ্বারোহী সৈন্য সামনাসামনি আক্রমণ করলে দেখতে পায় তাদের সামনের জায়গাটা অত্যন্ত সরু। ইতিমধ্যে তাদের দুই পাশের অশ্বারোহীরা এসে পড়লে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, এই সুযোগে বাবর তাঁর দুই পাশের বাকি অশ্বারোহী দলকে শত্রুদলের পিছন থেকে আক্রমণ করার জন্য ও সামনের দিক থেকে শত্রুপক্ষের মাঝখানে গুলি চালাতে থাকেন, নড়াচড়ার জায়গা না থাকার ফলে, আফগান সৈন্যরা একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। গুলির শব্দে হাতির দল এদিক ওদিক ছুটতে থাকে, ফলে অনেক সৈন্য হাতির পায়ে চাপা পড়ে মারা যায়, আর বাকি সৈন্যবাহিনী ভেঙে পরে, এই সময় ইব্রাহিম আক্রমণের জন্য এগিয়ে এলে তাঁকে হত্যা করা হয় ও তার মাথা কেটে বাবরকে উপহার দেওয়া হয়। পানিপথের যুদ্ধের পরেই ওই দিনই হুমায়ুনকে আগ্রায় পাঠানো হয়, বাবরের পক্ষ থেকে মহিদী খাজাকে দিল্লী পাঠানো হয়, শুক্রবার ২৭ এপ্রিল ১৫২৬ সালে দিল্লির মসজিদ থেকে বাবরের নামে এদেশে প্রথম খুৎবা পড়া হয়, একই সাথে সূচিত হয় ভারত ইতিহাসে মুঘল যুগ।

যুদ্ধ জয়ের পর সম্রাট বাবর পানিপথে নির্মাণ করেন একটি মসজিদ, একটি জলাশয় এবং একটি উদ্যান। সম্রাট বাবরের স্ত্রী কাবুলি বেগমের নামে যার নামকরণ করা হয় কাবুলিবাগ। পানিপথের তহশিল অফিসের কাছে রয়েছে ইব্রাহীম লোদীর কবর।

যুদ্ধে পারদর্শিতা ছাড়াও তিনি বহু গুনে গুণী ছিলেন, মৃত্যুর আগে তিনি একটি কবিতার বই লেখেন, যাকে খত-ই-বাবরী বলা হয়, সেখানে থেকে কবিতার কিছু বঙ্গানুবাদ –

“বাঞ্ছিত লক্ষ্য তুমি করো হে অর্জন,

অথবা স্বপ্ন কোনো ক’রো না দর্শন।

এ দু’য়ের কোনোটাই না হলে সাধন

উড়ে চলে যাও কোথা পাখির মতন!”

এ যেন বাবরের সমগ্র জীবনের কথা চারটি ছত্রে তুলে আনা। আবার শাসক ও যোদ্ধা হিসেবে তাঁকে জীবনের অধিকাংশ দিনই কাটাতে হয়েছে যুদ্ধ অভিযানে, তাই আপনজনদের সঙ্গে বিচ্ছেদে ভুগেছেন সর্বদা। এর পর ভারতের মাটিতে বাবর আরও দুটি যুদ্ধ করে মুঘল সাম্রাজ্যের ইমারত নির্মাণ সুনিশ্চিত করেন, অতঃপর  ২৬ ডিসেম্বর ১৫৩০ সালে তিনি মারা যান।

তথ্যসূত্রঃ মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান পতনের ইতিহাস (দুই খণ্ড) – অনিরুদ্ধ রায়, মধ্যযুগের ভারত (দ্বিতীয় খন্ড) – সতীশ চন্দ্র, বাবর – পিরিমকুল কাদিরভ, উইকিপিডিয়া

ছবিঃ উইকিপিডিয়া