গল্পকুটির ওয়েব ডেস্ক|

আমরা টিভির পর্দায় অথবা খবরের কাগজে প্রায় দিনই অত্মহত্যার খবর দেখে থাকি। তবে কখনও শুনেছেন বা দেখেছন কি পাখিরা আত্মহত্যা করছে? আসামের একটি ছোট্ট গ্রাম এমনই একটি রহস্যজনক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে কয়েক বছর ধরে। ওই গ্রামটি জাটিংগা নামে পরিচিত।

অজ্ঞাত কোনো কারণে হাজার হাজার পাখি এসে উপস্থিত হয় আসামের ঘন জঙ্গলে ঘেরা জাটিংগা গ্রামে। তারপর তারা আত্মহনন করার মধ্যে দিনে এক মারণ উৎসবে মেতে ওঠে। পাখিদের এভাবে আত্মহত্যার পিছনে কী রহস্য রয়েছে তা সামনে আনার জন্য গবেষণার অন্ত নেই। তবে বিজ্ঞান এখনো পর্যন্ত এর সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

তবে জাটিংগা গেলেই যে এই দৃশ্য দেখা যাবে তা নয়। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়েই ঘটে সেই কাণ্ড। আগস্ট থেকে অক্টোবর মাসেই হয় সেই মৃত্যু খেলা। বিশেষ করে অমাবস্যার সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলতে থাকে সেই অদ্ভুত ঘটনা। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এসে জড়ো হতে থাকে জাটিংগার আদিবাসী ঘরে জ্বালিয়ে রাখা আলোর উৎসের দিকে। তারপর তারা আলোর উৎসগুলির চারিদিকে গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে ঝাপ দিতে থাকে। ফলে বিভিন্ন জায়গায় ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। এভাবে সব পাখিগুলোই মরে যায় তা নয়। বেশিরভাগ পাখিগুলোই আধমরা হয়ে পড়ে থাকে, আর গ্রামবাসীরা সেই পাখিগুলোকে লাঠি দ্বারা আঘাত করে মেরে ফেলে। এভাবে পাখিদের মারার পর তারা সেই পাখিরদের মাংস আহার হিসাবে গ্রহণ করে।

তবে বর্তমানে ওই গ্রামে পাখিদের আসা অনেকটাই কমেছে। সঙ্গে কমেছে পাখিদের নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনাও। কিন্তু সমাধান হয়নি পাখিদের আত্মহননের রহস্য।

এই অদ্ভুত ঘটনাটি প্রথম ঘটেছিল ১৯০৫ সাল। ওই সময়ে জাটিংগাতে বসবাস করত একদল নাগা। এক অন্ধকার রাতে তাদের হারিয়ে যাওয়া একটি মহিষকে খুঁজতে বেরিয়েছিল তারা। হাতে ছিল জ্বলন্ত মশাল। কিছুটা পথ এগোনোর পড়েই তাদের উপর হতে থাকে পাখির বৃষ্টি। ওই ঘটনার কয়েক মাস পর নাগারা আতঙ্কে ওই অঞ্চল ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। জাটিংগায় এসে বসবাস শুরু করে নার আদিবাসীরা। তারা নাগাদের মুখে পাখি বৃষ্টির ঘটনার কথা আগেই শুনেছিল। তারপরেও ওই জায়গায় বসতি স্থাপন করে। ১৯১০ সাল নাগাদ নাররা বুঝতে পেরেছিল আত্মহননকরী পাখিদের ঘটনাটি প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেখা যায় এবং গ্রামবাসীদের আগুন জ্বালানো দেখে ওই পাখিরা চুম্বকের মতো আকর্ষিত হয়।

এরপর থেকে তারা বছরের সেই নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ির আশেপাশে আগুন জ্বালত পাখি শিকার করার জন্য। আর আলোর উৎস দেখে পাখিরা নেশার বশে ছুটে আসত মৃত্যু বরণ করতে। বিশ্বের মানুষের কাছে ঘটনাটি লুকিয়েছিল ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত।

ব্রিটিশ চা ব্যবসায়ী এবং পক্ষীবিশারদ E.P.Gee এই ঘটনাটি জানতে পেরে এসেছিলেন জাটিংগাতে। সম্পূর্ণ ঘটনা তিনি পর্যবেক্ষন করে ১৯৫৭ সালে একটি বই প্রকাশিত করেন। নাম ‘দ্য ওয়াইল্ডলাইফ অফ ইন্ডিয়া’। সেই থেকেই সামনে এসেছিল এই রহস্যের কথা।

১৯৭৭ সালে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে অর্নিথোলজিস্ট সুধীন সেনগুপ্তকে পাঠানো হইয়েছিল সেখানে। গবেষণা করে তিনি জানিয়েছিলেন, কুয়াশা এবং বৃষ্টির ফোঁটার উপর আলোকপাতের ফলে তৈরি হয় পাখিদের এই বিভ্রম। আরও অদ্ভুত বিষয় হল আত্মহননকারী প্রতিটি পাখিই দিবাচর এবং তারা পরিযায়ী।

বেশ কিছু গবেষকের মতে এটি একপ্রকার জিও ম্যাগনেটিক ফল্ট। অর্থাৎ পৃথিবীর ভৌগলিক এবং চৌম্বকীয় মেরুর অবস্থানের পার্থক্যের ফলে উৎপন্ন কোনও শক্তির পাখিদের বিব্রত করতে পারে বলে মনে করা হয়েছে।

অপর একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী বলা হয়েছে, সন্ধ্যায় বাসায় থাকা পাখিরা বিক্ষিপ্ত আলোর প্রভাবে অসময়ে সূর্যোদয় ভেবে বসে। ফলে সঠিক দিকনির্ণয় করতে না পেরে তারা ছুটে যায় আলোর উৎসের দিকে এবং ঢলে পড়ে মৃত্যুর মুখে। আর আলোর ওই অস্বাভাবিক বিচ্ছুরণের জন্য দায়ী হল ঘন কুয়াশার স্তর। এ বিষয়ে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। তবে এই ঘটনার পিছনে আসলে কী রহস্য রয়েছে তা এখনও জানা যায়নি।

ছবিঃ পিক্সাবে, বিবিসি এবং ট্রিপোটো