শুভজিৎ দে|
স্বাধীনতা আজ দেখতে দেখতে সিনিয়ার সিটিজেন হতে চলল। দেশবাসীর মন থেকে হয়তো মুছে গেছে তার স্মৃতি। হয়ত অনেকেই নাম শোনেননি, কিন্তু নেতাজি ঘনিষ্ঠ এই ‘স্পাই’ ছিলেন এক কন্যে, এককথায় ব্রিটিশদের আতঙ্ক ছিলেন তিনি। ভিয়েতনামে এক বিপ্লবী পরিবারের ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ সরস্বতী রাজামণি, ভিয়েতনাম মুক্তি যুদ্ধের একটি শ্লোগান, তোমার নাম আমার নাম, ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম। তার কিছুটা রেশ এই মেয়ের মধ্যে পড়েছিল এই মেয়ের ওপর, তাঁকে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। মাত্র ষোলো বছর বয়সেই কিশোরী দেশসেবায় উৎসর্গ করেছিলেন নিজেকে। তাঁর হাতে ব্রিটিশ সাহেবের প্রাণ যায়নি ঠিকই। কিন্তু দেশকে স্বাধীন করার পিছনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল কিশোরী গুপ্তচর সরস্বতী রাজামণির। তাঁদের বাড়িতে দেশপ্রেমের পরিবেশ প্রথম থেকেই ছিল। ফলে ছোট থেকেই রাজামণি ছিলেন পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে খুবই সচেতন।
রাজামণির যখন ১০ বছর বয়স, তাঁদের রেঙ্গুনের বাড়িতে এসেছিলেন মহাত্মা গাঁধী। তাঁকে আপ্যায়নের মাঝে বাড়ির লোকের হঠাৎ খেয়াল হয়, রাজামণিকে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের সঙ্গে একরত্তি মেয়েকে খুঁজতে সামিল হন গাঁধীজিও। শেষে বাড়ির বাগানে বন্দুক হাতে দেখা যায় ১০ বছরের রাজামণিকে। তাঁর মতো ছোট মেয়ের হাতে বন্দুক কেন, গাঁধীজির এই প্রশ্নের উত্তরে বালিকা রাজামণি বলেছিলেন, বড় হয়ে ব্রিটিশদের মারতে চান। অত ছোট মেয়ের মুখে এই উত্তর শুনে চমকে যান গাঁধীজি। উত্তরে ছিল আরও চমকপ্রদ, যা সুচারুভাবে স্থির করেছিল এই মেয়ের ভবিতব্য। বলেন, তাঁরা অহিংস উপায়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। সরস্বতীরও উচিত অহিংসার পথ বেছে নেওয়া। শুনে বালিকার উত্তর ছিল, ‘‘আমরা তো ডাকাতদের মেরেই তাড়িয়ে দিই। ব্রিটিশরা তো আমাদের লুঠ করছে। তা হলে আমরা তাদের মারব না কেন?’’
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রত্যেক দেশবাসীকে অস্ত্র তুলে নিতে বলেছিলেন নেতাজি। তাঁর এই আহ্বান দাগ কেটে গিয়েছিল ষোড়শীর মনে। নেতাজী রাজামণিকে দেখেছিলেন ষোলো বছর বয়সে। তখন নেতাজি এসেছিলেন রেঙ্গুনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে তখন তাঁর লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতার যুদ্ধে অর্থ সংগ্রহ এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা আইএনএ-এর জন্য স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ। স্বপ্নের দেশনায়কের বক্তৃতা সামনে শুনে সেখানেই খুলে দিয়েছিলেন নিজের মূল্যবান গয়না। পরের দিন খোঁজ নিয়ে রাজামণির বাড়িতে আসেন নেতাজি। তাঁর বাবাকে বলেন, রাজামণি হয়তো সরল মনে সব গয়না দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তিনি এত মূল্যবান গয়না নিতে পারবেন না। নেতাজির সামনে স্মিত হেসে নীরব ছিলেন রাজামণির বাবা। তিনি এর আগেও নেতাজির দলে বহু অর্থ দান করেছেন। কিন্তু এ বার তাঁকে কোনও কথা বলতে না দিয়ে উত্তর দিলেন রাজামণি নিজে। সুভাষচন্দ্র বসুর সামনে দাঁড়িয়ে দৃপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন, ওই গয়না তাঁর বাবার নয়, বরং তাঁর নিজের। তাই তিনি স্বেচ্ছায় দেশের সেবায় গয়না দান করেছেন। আর ফিরিয়ে নেবেন না। তাঁর মানসিক দৃঢ়তাকে আর উপেক্ষা করতে পারেননি নেতাজি।
নেতাজি বলেন, ‘‘লক্ষ্মী আসেন, আবার চলেও যান। কিন্তু সরস্বতী একবার এলে আর যান না। তোমার মধ্যে মা সরস্বতীর জ্ঞান বিরাজ করছে। এখন থেকে আমি তোমার নাম দিলাম সরস্বতী।’’ তার পর থেকে তিনি পরিচিত হলেন সরস্বতী রাজামণি নামে। এবং পরবর্তী কালে তিনি পরিচিত হন সরস্বতী নামেই। এখানেই শেষ নয়, নেতাজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অহিংসার পথে তাঁর আর যাওয়া হয়নি। নিজের জীবন সরস্বতী উৎসর্গ করেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পায়ে।
সেবারই চার জন বন্ধুর সঙ্গে রাজামণি যোগ দেন আইএনএ-তে, গুপ্তচর হিসেবে। ছেলের ছদ্মবেশে তাঁরা ফাইফরমাশ খাটার লোক হিসেবে যোগ দিতেন ব্রিটিশ মিলিটারি ক্যাম্প এবং অফিসারদের বাড়িতে। ব্রিটিশ সরকার ও সেনাবাহিনীর গোপন তথ্য আইএনএ-কে পাচার করাই ছিল তাঁদের কাজ। ছেলের ছদ্মবেশে রাজামণি নাম নিয়েছিলেন ‘মণি’।
তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া
ছবিঃ দ্য বেটার ইন্ডিয়া

কমেন্টস
Hi, , sending good wishes.