শুভজিৎ দে|
ব্যাংক জাতীয়করণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বনাম উপপ্রধানমন্ত্রীর বিবাদের জেরে ভেঙেছিল শাসক কংগ্রেস দলও৷ আজকের প্রজন্ম সেভাবে পরিচিত নয় ‘ব্যাংক ফেল’ হওয়ার সঙ্গে ৷ কিন্তু স্বাধীনতার আগে বলে নয় তার পরেও বেশ কয়েক বছর এদেশে মাঝে মধ্যেই ব্যাংকে তালা পড়তে দেখা যেত ৷ একদিকে সেজন্য কাজ হারাতেন সেই ব্যাংকের কর্মীরা আবার অন্যদিকে সেখানে সঞ্চিত টাকা রেখে সর্বস্ব খুইয়ে পথে বসতেন গ্রাহকরা৷ তখনকার বহু গল্প উপন্যাস কিংবা সিনেমায় এই ব্যাংক উঠে যাওয়া কথা উঠে আসত ৷ কারণ অবশ্য সেসময় ব্যাংক জাতীয়করণ হয়নি ফলে সেগুলি ছিল বেসরকারি মালিকানায়৷ এই সামাজিক ব্যাধির পাশাপাশি বাম এবং ব়্যাডিকাল কংগ্রেস নেতারা মনে করতেন এই রকম ব্যাংক ব্যবস্থার ফলে বেসরকারি হাতে পুঁজি সঞ্চিত হচ্ছে যা একেবারেই কাম্য নয়৷ ফলে ব্যাংক জাতীয়করণ করার জন্য দাবি উঠত ৷ অবশেষে ১৯৬৯ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংক জাতীয়করণ করেন৷ পরবর্তীকালে আবার ১৯৮০ সালে আরও ছয়টি ব্যাংক জাতীয়করণ করা হয়েছিল৷ তবে ব্যাংক জাতীয়করণ ঘিরে ইন্দিরা গান্ধী এবং মোরারজি দেশাইয়ের সম্পর্কের তিক্ততা চরমে পৌঁছেছিল৷
১৯৬৯ থেকে ২০১৯— মানে কেটে গেছে ৫০ বছর। অর্থাৎ অতীতের ১৩টি ব্যাঙ্কের সঙ্গে গত ৫০ বছরে আরও ১৪টি ব্যাঙ্ক যুক্ত হয়েছে। আর এই ব্যাঙ্কগুলিই আজ সরকারি ব্যাঙ্ক। এদের সরকারিকরণের ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে অর্থাৎ স্বর্ণ জয়ন্তী যাকে বলে।
১৯৬৯ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তিনি টের পাচ্ছিলেন একদিন যারা মোরারজি দেশাইকে ঠেকিয়ে দেন, ‘গুঙ্গি গুড়িয়া’ অর্থাৎ ইন্দিরা গান্ধীকে গদিতে বসিয়ে নিজেরাই দেশটি চালাবেন তারা যে অঙ্কে নেহাতই কাঁচা, তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। সেই সিন্ডিকেটের চাঁই চাঁই নেতা অর্থাৎ পূর্ব ভারতে অতুল্য ঘোষ, পশ্চিম ভারতে এস কে পাটিল, দাক্ষিণাত্যে, মাদ্রাজে কে কামরাজ এবং বেঙ্গালুরুতে নিজলিঙ্গাপ্পা, ইউপি–তে সি বি গুপ্তদের এবার প্রকৃত সত্যটা বোঝানো দরকার। তাঁদের বোঝাতেই হবে ইন্দিরা আর যাই হন ‘গুঙ্গি গুড়িয়া’ অর্থাৎ বোবা পুতুল নন।
বেঙ্গালুরুতে ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং–এ বোমা ফাটালেন ইন্দিরা। দুটি প্রধান দাবি তাঁর। তিনি চান, সংবিধান সংশোধন করেও ‘রাজন্য ভাতা’ বিলোপ করতে। আর কত বছর স্বাধীন ভারত অতীতের রাজা, মহারাজা, নবাবদের ভাতা দেবে? দুই সিপিআই— সিপিআই ও সিপি (এম)–ও তাই চায়। তাঁর দ্বিতীয় দাবি বেসরকারি ব্যাঙ্কের জাতীয়করণ। ইন্দিরার মতে বেসরকারি ব্যাঙ্কের প্রোমোটার/মালিকরা বড় বড় কর্পোরেট হাউসের মালিক/প্রোমোটার বা তাদের অনুগত ভৃত্য। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত টাকা ব্যাঙ্কে যা জমা রয়েছে, সেই জমা টাকাই খাটছে কর্পোরেট হাউসের কলে–কারখানায়। কী সুদে ওই ধার দেওয়া হয় তা যেমন জানা যায় না, তেমনি জানা যায় না ঋণের বহর। অথচ গরিব মানুষ, খেটেখাওয়া মানুষ, ছোটখাট ব্যবসার মালিক মাথা খুঁড়লেও কোনও ঋণ পায় না। তাদের পরিষ্কার বলা হয় ধার পেতে হলে ঋণের পরিমাণের সমতুল্য জমি, বাড়ি ইত্যাদি ব্যাঙ্কের কাছে মর্টগেজ রাখতে হবে।
ব্যাঙ্ক হাতে এলেও, প্রথম ১০/১১ বছর যেমন চলছিল, তেমনই চলল। যেমন কলকাতায় সদর এই তিনটি ব্যাঙ্ক ইউবিআই, ইউকো এবং এলাহাবাদ যথারীতি চা–বাগান, বিড়লা এবং চটকলগুলির পুঁজি জোগান দিতে লাগল। টাটাদের সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক মূলত টাটা কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত রইল ইত্যাদি।
কিন্তু জনতা পার্টির তিন বছর শাসনের পর ইন্দিরা গান্ধী দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় যখন ফিরলেন সেই ১৯৮০ সালে, গোটা দেশ এক নতুন কথা শুনল। তখন অর্থমন্ত্রী কর্ণাটকের জনার্দন পূজারী। তিনি চালু করলেন ব্যাঙ্কের টাকায় ‘লোন মেলা’। বহু মেলার দেশ বলে পরিচিত ভারত এই প্রথম টাকার মেলা দেখল। কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলির চাষিদের এই মেলা দেখার সৌভাগ্য হল। সরকারি তরফে ‘লোন’ বা ‘ধার’ হলেও চাষিদের কংগ্রেসিরাই বলে দিয়েছিল শোধ দেওয়ার দরকার নেই। শুরু হল একদা বেসরকারি, ১৯৬৯–এর পর সরকারি ব্যাঙ্কের টাকা নিয়ে নেতাদের মোচ্ছব।
পরে ব্যাঙ্কের বকেয়া না পেয়ে ব্যাঙ্কের কর্তারা বেঁকে দাঁড়াল, বললেন, যে ধার শোধের ব্যবস্থা নেই সেই ধার দেব না। তখন শুরু হল ‘লোন ওয়েভার’। বলা হয়, তখন রাজ্যে রাজ্যে খরা, বন্যা ইত্যাদি নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত চাষের ধার আর শোধ দিতে হবে না। এরই পরিণতি সরকারি ব্যাঙ্কগুলির সাড়ে ১০ লাখের ওপর ঋণ যা আর কোনওদিনই শোধ হবে না। গালভরা ইংরেজি নাম ‘নন পারফর্মিং অ্যাসেটস’। অর্থাৎ যে সম্পদের কাছ থেকে সুদ বা আসল, কোনওটাই আর পাওয়া যাবে না। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নীরব মোদি, মেহুল চোকসি বা ছন্দা কোছারদের ‘নীরব’ আত্মসাতের বিচিত্র লীলা। ৫০ বছরে চাষি, সাধারণ মানুষ, ছোট ব্যবসায়ীরা সরকারি ব্যাঙ্কের কী সাহায্য পেয়েছেন তা তাঁরাই জানেন, শুধু ব্যাঙ্কগুলি জানে তাদের আজ নাভিশ্বাস উঠেছে। আজ ব্যাঙ্কগুলির এমনই অবস্থা যে একজন স্টাফ অবসর নিলে, তার জায়গায় লোক নেওয়ার ক্ষমতা নেই। বহু ব্যাঙ্কই উঠে যাওয়ার মুখে। এ ব্যাপারে এসবিআই বা ইউবিআই— বৃহত্তম বা ক্ষুদ্রতম সরকারি ব্যাঙ্কে কোনও তফাত নেই।
আজ আবার পরিস্থিতি ১৯৬৯ এর আগে চলে যাবার উপক্রম হয়েছে, দেশের টাকা পলাশীর লুণ্ঠনের মাধ্যমে যেমন বিদেশে গিয়েছিল, ঠিক তেমনই এই সময় বড় বড় ব্যবসায়ীরা ঋণ নিয়ে, তা না মিটিয়ে বিদেশে পলায়ন করছে, তাতে এদেশের সম্পদের অবনমন হচ্ছে বলে আমার মনে হয় ।
ছবি সৌজন্যেঃ টাইমস অব ইন্ডিয়া

