আদিত্য গুপ্ত|
পুরনো কলকাতার গল্পগাছা যেন এক অন্য শহরের কথা বলে। তিনশো বছর পেরিয়ে আসার পথে শহরটা যে কতটা বদলেছে তা বোঝা যায় এই সব পুরনো দিনের গল্প করতে বসলে। এর আগে একদিন আমরা গৌরী সেনের কথা আলোচনা করেছি। লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন। সেই ‘গৌরী সেন’। আসুন আজ বলা যাক নকু ধরের কথা। হ্যাঁ, স্বভাবে তিনিও যেন গৌরী সেনেরই মতো। গুচ্ছ গুচ্ছ টাকা তাঁর। আর তিনি টাকা জোগাতেন খোদ ইংরেজদের!
না গল্পকথা নয়, এটা ইতিহাস। গৌরী সেনের মতো তিনিও রয়ে গিয়েছে এক প্রবাদের মধ্যে। প্রবাদটি হল— গোবিন্দরামের ছড়ি/ উমিচাঁদের দাড়ি/ নকু ধরের কড়ি/ মথুর সেনের বাড়ি। বুঝতেই পারছেন, যে ব্যক্তি প্রবাদ হয়ে গিয়েছেন, তাঁর প্রতিপত্তি কেমন ছিল।
নকু ধরের আসল নাম লক্ষ্মীকান্ত ধর। কিন্তু লোকে ডাকত নকু ধর বা নকুর ধর বলে। ছিলেন লর্ড ক্লাইভের মুৎসুদ্দি বা দেওয়ান। তাঁর কাছে হাত পাতত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। বলতে পারতেন ইংরেজিও। সেকালের এক মানুষ হয়েও ইংরেজদের ভাষা শিখে নিতে আটকায়নি তাঁর? কী করে শিখলেন? সেও এক অদ্ভুত গল্প।
কোনও একদিন সকালে গঙ্গার ঘাটে বসে জপ করছেন নকু ধর। হঠাৎই তাঁর চোখে পড়ল এক অর্ধমৃত দেহ! তাও আবার সে দেহ এক ইংরেজের। ভেসে আসছে গঙ্গা দিয়ে। চমকে উঠলেন নকু। তখনই ডাক পড়ল ভৃত্যদের। সবাই মিলে তুলে আনা হল সেই ইংরেজকে।
আসলে মাঝগঙ্গায় তলিয়ে গিয়েছিল এক মালবাহী নৌকা। বাকিরা তলিয়ে গেলেও এই বলিষ্ঠ চেহারার ইংরেজের শরীরে তখনও প্রাণ ছিল। ক্রমে নকু ধরের নতুন বাজারের বাড়িতে রীতিমতো আদর-যত্নে আবারও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন সেই ইংরেজ ব্যক্তি। আর তাঁর সাহচর্যে নকুও হয়ে উঠলেন ইংরেজিতে পারদর্শী।
ক্রমে সাহেবদের সঙ্গে তাঁর মেলামেশা আরও বাড়ল। আর তারপরই তিনি হয়ে বসলেন লর্ড ক্লাইভের মুৎসুদ্দি বা দেওয়ান। কেবল টাকার জন্যই নয়, ইংরেজরা তাঁর সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনাও করত! নিত তাঁর পরামর্শ। এমনই ছিল নকু ধরের প্রতিপত্তি।
তখনও পর্যন্ত পলাশীর যুদ্ধ হয়নি। বণিকের মানদণ্ড দেখা দেয়নি রাজদণ্ড রূপে। দু’হাতে রোজগার করেছেন নকু। আর প্রয়োজনমতো লোককে দিয়েছেনও।
তারপর যুদ্ধ হল। দেশ হল পরাধীন। যুদ্ধশেষে বিদায় নিলেন ক্লাইভ। এলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। তিনি তখন কলকাতার গভর্নর। ইংরেজদের সঙ্গে মারাঠাদের যুদ্ধে হেস্টিংসকে অর্থ সাহায্য করেন নকু ধর। তিনি হেস্টিংস সাহেবকে দিয়েছিলেন ৯০ লক্ষ টাকার তোড়া! হ্যাঁ, ৯০ লক্ষ। সে সময়ের ৯০ লক্ষের মূল্যটা আজকের দিনে কত? হিসেব না করাই ভালো। খামোখা মাথা ঘুরবে।
এই হলেন নকু ধর। যাঁর ‘কড়ি’ আজও বাংলার লোকশ্রুতিতে জীবন্ত হয়ে রয়েছে। নকু ধরের নাতি সুখময়ও ছিলেন সেযুগের এক বিখ্যাত ব্যক্তি। তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দিয়েছিল ইংরেজরা। আসলে সুখময় নয়, নকু ধরকেই সেই উপাধি দিতে চেয়েছিল সাহেবরা। কিন্তু নকু আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন, রাজা হতে তিনি চান না। যদি কাউকে রাজা করতেই হয়, করা হোক তাঁর নাতিকে।
শেষ পর্যন্ত তাঁর মনোবাঞ্ছাই পূর্ণ হয়েছিল। দিল্লির দরবার থেকে এসে পৌঁছল সুখময়ের উপাধি— মহারাজা। রাজা সুখময়ের দানধ্যানের কথাও এক কিংবদন্তি। সে গল্প পরে কখনও করা যাবে।
(ঋণ: পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘কলকাতার রাজকাহিনী’)

কমেন্টস
I am very glad to know the unknown stories of our beloved personalities from Galpo Kutir.
Never thought I would find such an interesting story of one of our bangali babu.. Thank you.