গল্প কুটির ওয়েব ডেস্ক।

সমাজের জন্য মাদার টেরেসা যা করে গিয়েছেন তা নিয়ে ভাষায় লিখতে গেলে শব্দ কম পড়বে। কিন্তু এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যাঁরা মাদার টেরেসার লক্ষ্য এবং আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সমাজকে একটা নতুন দিশা দেখানোচ চেষ্টা করছেন। তেমনই একজন হলেন অনুরাধা কৈরালা, যাঁর কাছে মানুষের সেবা করাই পরম ধর্ম। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ছোট ছোট শিশুদের লেখা-পড়া শেখাতেন তিনি। কিন্তু একদিন এই কাজ করতে করতেই বড় কিছু ভেবে ফেললেন তিনি। এরপরেই সমাজে নিপীড়িত, নির্যাতিত মহিলাদের পাচার হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে এনেছেন নেপালের মাদার টেরেসা অনুরাধা কৈরালা।

অনুরাধা দেবীর জন্ম হয় নেপালের ১৯৪৯ সালের ১৪ এপ্রিল। নিজের জীবনে দীর্ঘ কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করেছেন অনুরাধা দেবী। এরপর নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে একটু একটু করে বদলে যেতে থাকে তাঁর জীবন। সমাজের কাছে তাঁর আলাদা করে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি সমাজের অসংখ্য মহিলার কাছে তিনি হয়ে ওঠেন মাদার টেরেসা। কাঠমান্ডুর পশুপতিনাথ মন্দিরের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গিয়েছে, সেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মহিলাকে রাস্তায় ভিক্ষা করতে দেখতেন তিনি। নিজের চোখের সামনে দেখতেন মহিলাদের অসহায়তা কতটা চরম, কতটা কঠিন। তাদের প্রতি এক মারাত্মক কৌতূহল জাগে অনুরাধা দেবীর মনে। এরপর থেকেই ওইসব মহিলাদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন তিনি। তাদের পরিবার, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি সবকিছুই একটু একটু করে জানতে শুরু করেন। তাদের কাহিনি জানতে জানতে তিনি নিজের জীবনের সঙ্গে মিল পান। একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে একবার একটি সাক্ষাতকারে এসে বলেছিলেন, অনুরাধা দেবীর প্রাক্তন স্বামী তাঁর ওপর অকথ্য শারীরিক নির্যাতন চালাতেন। সেই সময়ে তাঁর কাছে প্রতিটা দিন ছিল প্রবল চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে দিন কাটত তার। সেই সময় পরিস্থিতি অনেকটাই কঠিন ছিল কারণ মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া তাঁর কাছে আর কোনও উপায় ছিল না। কারণ তখন তিনি জানতেনও না যে এই ধরণের অভিযোগ কার কাছে করতে হবে, কাকে গিয়ে বললে কাজ হবে। ব্যক্তিগত জীবনের এই তিক্ত অভিজ্ঞতাই তাঁকে সমাজের নিপীড়িত শ্রেণীর জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এরপরই তিনি ঠিক করেন যে, লিঙ্গ-ভিত্তিক যে সহিংসতা তা নিয়ে কাজ করবেন। নারীর ক্ষমতায়ণ নিয়ে কাজ করবেন।

কিন্তু বিষয়টি যত সহজ বলে মনে হচ্ছে আদৌ কিন্তু ততটা সহজ ছিল না। কারণ মানুষ যা করে, পেটের তাগিদেই। তাই ভিক্ষা করা ছেড়ে দিলে তাদের কী হবে এই ভেবেই প্রথমে একেবারেই সাড়া পাননি। প্রথম প্রথম কেউই আসত না তাঁর কাছে। এরপর তিনি তাদের বলেন যে, রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করা বন্ধ করে দিলে তিনি তাদের সাহায্য করবেন। কিন্তু তার পরেও হাতে গুণে কেবলমাত্র সাত-আটজন করে মেয়ে আসত তাঁর কাছে। ছাত্র পড়িয়ে যে পয়সা আয় করতেন সেখান থেকেই তাঁর কাছে আসা প্রত্যেক মহিলাকে ১০০০ টাকা করে দিয়েছিলেন তিনি। রাস্তার ধারে ছোট দোকান শুরু করার জন্য। পরিবর্তে তাঁদের কাছ থেকে ২ টাকা করে সংগ্রহ করেন। এভাবে চলতে চলতেই একদিন তাঁর এই স্বপ্নকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়ে ১৯৯৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন মাইতি নেপাল’ সংস্থা।

কী এই মাইতি নেপাল সংস্থা?- শুরুটা হয়েছিল নেপালেরই একচিলতে ঘর থেকে। সেখানে পতিতালয় থেকে মেয়েদেরকে তুলে এনে আশ্রয় দিতেন তিনি, কারণ সেইসময়ে তাঁদের মাথার ওপর কোনও ছাদ ছিল না। আসলে যৌন পাচার চক্রের শিকার হওয়া মেয়েদের তাঁদের পরিবার বা বন্ধু-বান্ধব কেউই গ্রহণ করত না, আজও করে না অবশ্য। সমাজের এই অসহায়, নিঃসঙ্গ মহিলাদের উদ্ধার করে তাঁদের আশ্রয় দেওয়া এবং তাদের সবরকমের দায়িত্ব নেওয়া- এই যাবতীয় কাজ সামলাতো মাইতি নেপাল,  যার নেতৃত্ব দিতেন অনুরাধা কৈরালা। যতদিন না এইসব মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারছে ততদিন সেইসব মেয়েদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেই এই।

সংস্থাটি বর্তমানে একাধিক কর্মসূচীও পালন করেন, যার মধ্যে রয়েছে সচেতনতা বৃদ্ধি, সম্প্রদায় সংবেদনশীলতা কর্মসূচী, নারীদের উদ্ধার অভিযান, পাচারকারীদের গ্রেফতার করা। উদ্ধারকারীদের আইনি সাহায্য প্রদান করা, মহিলাদের ক্ষমতায়ন কর্মসূচী পাশাপাশি মহিলাদের জন্য অ্যান্টি রেট্রো-ভাইরাল থেরাপি ইত্যাদি। এইভাবে প্রায় ১৮,০০০ মেয়েকে পাচার হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন তিনি ও তাঁর সংস্থা। বর্তমানে এই সংস্থার সুনাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

সমাজের বুকে অসামান্য এই অবদানের জন্য তিনি একাধিক স্বীকৃতিও পেয়েছেন। এখনও পর্যন্ত তাঁর ঝুলিতে ৩৮টি জাতীয় পুরস্কার এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন। শুধু তাই নয়, ভারতের চতুর্থ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ২০১০ সালে তিনি ‘সিএনএন হিরো অব দ্য ইয়ার’  সম্মানও প্রদান করা হয়েছে। বয়সের ভারে আজ হয়তো তিনি খানিকটা ঝুঁকেছেন কিন্তু সমাজের তরফে অন্যায়, নিপীড়ন-এর সামনে মেয়েদেন মাথা নীচু না করার পাঠটাই শিখিয়ে গিয়েছেন।