গল্প কুটির ওয়েব ডেস্ক|

কথিত আছে সপ্তদশ শতকের শেষে ভৃত্য হিসাবে ভারতে আনা হয়েছিল তাদের। সেই মানুষগুলি যাদের সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই নিম্নশ্রেণীর তকমা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ত্বকের রঙের উপর ভিত্তি করে যাচাই করা হত দক্ষতা, তাদের যোগ্যতার মাপকাঠি ছিল তাদের কৃষ্ণবর্ণ। যদিও এদেশে কে তাদের এনেছিল এই নিয়ে রয়েছে দ্বিমত। অনেকে বলেন পর্তুগিজরা প্রথম তাদের সাথে এই আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গদের ভারতে নিয়ে আসে আবার কেউ বলেন যে তারও আগে আরব থেকে এদের নিয়ে আসা হয়েছিল এই দেশের মাটিতে।

দাসপ্রথার অবসান ঘটলে এরা জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। প্রায় অজ্ঞাতবাসের মতো করেই তারা জীবনধারণ করতে থাকে যাতে না আবার তাদের অন্য কারোর দাস হয়ে থাকতে হয় ও অসহনীয় অত্যাচার সহ্য করতে হয়। ইতিহাসের পাতায় মলিন হয়েছে এই কাহিনি। পরবর্তীকালে ভারত সরকারের উদ্যোগেই এই সম্প্রদায় পায় তাদের বাসভূমি ও সম্মান। সম্প্রদায়টি সিদ্দি বা হাবশী সম্প্রদায় নামে পরিচিত। একমাত্র ও বিচ্ছিন্ন সম্প্রদায় হিসাবে সিদ্দি গুজরাট, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র এবং অন্ধ্র প্রদেশের উপকূলে বিস্তৃত। ৫০,০০০-৬০,০০০ জন আনুমানিক জনসংখ্যার সিদ্দি সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই মুসলিম ধর্মাবলম্বী। এদের প্রধান জনসংখ্যা জুনাগড় জেলায় কেন্দ্রীভূত। 

বিস্ময়কর এই যে- এখনও ভারতের মধ্যেও আছে এমন এক টুকরো আফ্রিকা, যার পরতে পরতে রয়েছে আফ্রিকান সংকৃতির ছাপ। ভারতের এই বিশেষ অংশটির কথা হয়তো অনেকে ভারতবাসীর কাছেই অজানা। তবে এই হিন্দিভাষী আফ্রিকান মানুষগুলি কিন্তু মনেপ্রাণে ভারতীয়। তারা ভারতকে নিজের মাতৃভূমি ভেবেই সম্মান ও শ্রদ্ধা করে। শতাধিক বর্ষ ধরে এই সম্প্রদায় ভারতে বসবাস করছে। 

তাদের মধ্যে দক্ষতা ও যোগ্যতার অভাব যে সত্যিই নেই তা সকলের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় আশির দশকের পরে। তখনকার ক্রীড়ামন্ত্রীর সিদ্ধান্তে খোঁজ করা শুরু হয় তাদের, কারণ ছিল ১৯৮৪ অলিম্পিক গেম্স। আফ্রিকান এই ভারতীয়রা অলিম্পিকে ভালো পারফর্ম করতে পারবে এই জন্য শুরু করা হয় কড়া অনুশীলন। ১৯৮৫তে স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া-র উদ্যোগে তাদের জন্য স্পেশাল এরিয়া গেমস চালু হয় এবং বিশেষ ট্রেনিং শুরু করা হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকা আফ্রিকান অরিজিন এর ভারতীয়রা একত্রিত হয় স্পোর্টসের মাধ্যমে। স্টেট, ডিস্ট্রিক্ট, ন্যাশনাল লেভেলে তারা জিততে থাকে একাধিক পুরস্কার।

আফ্রিকান রীতি, নীতি, সংস্কৃতি এসবের প্রতিফলন খুব সুন্দরভাবেই দেখা যায় তাদের বসত গ্রামগুলিতে। এই সম্প্রদায়ের মহিলারাও সমানভাবে অংশগ্রহণ করে সব কাজে। এখনো এদের জীবিকা নির্বাহের একটা প্রধান অঙ্গ হল এদের বিশেষ নাচ যা দেখিয়ে মানুষের মনোরঞ্জন করে তারা অর্থ উপার্জন করে থাকে। অনেকে আবার মেট্রোপলিটন শহরে এসে চাকরিও করে তার সংখ্যা যদিও খুব সামান্য। ভারতের আফ্রিকান অধিবাসীরা কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার দরুন এখনো অনেকেই তাদের হেয় করে কিন্তু এই সিদ্দি সম্প্রদায়ের ঝুলিতে রয়েছে জুজে জ্যাকি হারনোডকার সিদ্দি, কমলা বাবু সিদ্দি, ফিলিপ এন্টোনি সিদ্দি ইত্যাদির মতো বহু নাম যাঁরা ইন্ডিয়ান স্পোর্টস হিস্ট্রিতে স্মরণীয় স্থান দখল করে আছেন।

আর এরকম এক গ্রামে কয়েকদিন অতিবাহিত করার লোভনীয় সুযোগের সদব্যবহার বোধহয় যে কোন ভ্রমণপিপাসু ব্যক্তিই করতে চাইবেন। এই জুনাগড় হল গুজরাটের একটা ছোট্ট মফঃস্বল শহর। কলকাতা থেকে জুনাগড় পৌঁছনোর উপায় হিসাবে রেলপথ ও আকাশপথ দুটিই সম্ভব। স্বাভাবিকভাবেই রেলপথ অনেক সাশ্রয়ী তবে রেলপথে সময় লাগবে অনেক বেশী এবং যাত্রা হবে ক্লান্তিকর।

  • হাওড়া থেকে মোটামুটি ৮০০-১০০০টাকার টিকিটে আমেদাবাদ স্টেশন, সেখান থেকে ট্রেনে করে জুনাগড়।
  • অথবা কলকাতা থেকে দিল্লি হয়ে আমেদাবাদ এবং সেখান থেকে ট্রেনে চেপে জুনাগড়। এক্ষেত্রে সময় কম লাগবে, খরচ হবে তুলনামূলক বেশী। 
  • একটু বাজেট বাড়ালে সবথেকে বেস্ট অপশন ফ্লাইট। কলকাতায় বিমানবন্দর থেকে সরাসরি পৌঁছনো যাবে আমেদাবাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। সেখান থেকে বাসে করে সোজা জুনাগড়। মাথাপিছু খরচ পড়তে পারে ৪০০০।

হাবশীদের সাথে থেকে, তাদের জীবনযাপন ও জীবনধারণকে উপলব্ধি করা এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। এছাড়া জুনাগড়েই পেয়ে যাবেন ন্যুনতম ৬০০-১০০০টাকা মূল্যে হোটেল। ঘুরে দেখতে পারেন জুনাগড় দুর্গও। বিলাসিতাপূর্ণ ট্রিপ নয় অজানাকে আস্বাদনের তাগিদে যাঁরা ছুটে বেড়ান পৃথিবীর নানা প্রান্তে তাঁরা দেশের মধ্যে থাকা এই উল্লেখযোগ্য জায়গাটি মিস করবেন না একদমই।

অনেকগুলি ফুলের পাঁপড়ি নিয়ে যেমন একটা ফুল হয়, তেমনি ভারতের এই “মিনি আফ্রিকা” ভারতেরই একটা অংশ। সর্বজাতি-সর্বধর্ম-সমন্বয়ে বিশ্বাসী ভারতবাসীর গর্ব তারা। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

ছবি সৌজন্যেঃ ডিএনএইন্ডিয়া, ফার্স্টপোস্ট, সিএনট্রাভেলার, ইন্ডিয়াওয়েস্ট, ইউটিউব