গল্প কুটির ওয়েব ডেস্ক|
শীতে সন্ধ্যে নামার সাথে সাথেই ‘তার’ খোঁজে ভিড় জমে যায় রাস্তার ধারের ছোট ছোট খাবারের দোকানগুলিতে। আবার নামজাদা কোনও রেস্তোরাঁয় গিয়ে স্টার্টারে ‘তাকে’ই চাই। প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান, সারা বিশ্বই ‘তার’ স্বাদে মুগ্ধ। নানান স্বাদে ভরপুর, জ্বলন্ত কাঠকয়লার আঁচে ঝলসানো মাংসের গন্ধ নাকে আসলেই জিভে জল আসতে বাধ্য। গুমটি দোকান থেকে শুরু করে পাঁচ তারা হোটেল, তার কদর সর্বত্র। এতক্ষণে নিশ্চই বুঝতে পেরেছেন কার কথা বলছি? হ্যাঁ ঠিকই বুঝেছেন, এতক্ষণ কাবাব এবং তন্দুরেরে কথাই বলছিলাম।
ভারতের অন্যান্য জায়গার মতো কলকাতার কাবাবও বেশ বিখ্যাত। বিশেষ করে তালতলা, নাখোদা মসজিদ, কলুটোলা, রবীন্দ্রে সরণী, ক্যানিং স্ট্রিট, পার্ক স্ট্রিট, ফিয়ার্স লেন, গালিব স্ট্রিট ও জাকারিয়া স্ট্রিটের কথাই মাথায় আসে। শুধু আমিষ নয়, নিরামিষ নানা রকমের কাকাবও পাওয়া যায়। তবে মানুষের চাহিদা বেশী মাংসের তৈরি কাবাবের প্রতি। ঢিমে ঢিমে আঁচে তৈরি হরেকরকম কাবাবের গন্ধে ম ম করে কলকাতার রাস্তাঘাট। তবে জানেন কি কলকাতায় এই কাবাব এলো কীভাবে? না জানা থাকলে বলি, কলকাতায় প্রথম কাবাব আসে মুসলিম শাসকদের হাত ধরেই। তাঁদের অন্যান্য সুস্বাদু খাবারের মধ্যে অন্যতম ছিল কাবাব। আর সেই কাবাব পরবর্তীকালে কলকাতায় নিজের জায়গা করে নেয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই খাবারটি ‘কাবাব’ নামে পরিচিত হলেও এটি একটি তুর্কি শব্দ।
দেখতে গেলে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হল কাবাব। মরোক্কান পরিব্রাজক ইবন বতুতার লেখায় জানা যায়, ১২০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে ভারতে মুঘল সম্রাটদের খুবই পছন্দের একটি খাবার ছিল কাবাব। আফগান রাঁধুনিরা মুঘল সম্রাটদের জন্য নিত্যদিন বিভিন্ন রকমের কাবাব রান্না করতেন।
শোনা যায়, পারস্য শব্দ ‘কম’ ও ‘আব’ অর্থাৎ ‘কম জল’ থকেই কাবাবের জন্ম। কারণ হিসাবে বলা যায় কাবাব তৈরির সময় কোনোরকম জলের প্রয়োজন হয় না।
অনেকে মনে করেন কাবাবের জন্ম মধ্যপ্রাচ্যে। তবে রান্নার প্রাচীন সংস্কৃত পুঁথি ‘ক্ষেমকুতূহলম’-এ কাবাব পদটির উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়৷ রামায়ণ ও মহাভারতের মতো পৌরাণিক কাব্যেও কাবাবের উল্লেখ রয়েছে। যেখানে হরিণ ও খরগোশের ন্যায় প্রাণীর মাংস খোলা আকাশের নীচে পোড়ানোর কথা বলা আছে।
সব দিক বিবেচনা করে বলা যায় মুঘলদের বহু আগে আফগানদের সাথেই ভারতে কাবাবের আগমন হয়েছিল।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় তুর্কির সৈনিকরা শিকার করা পশুর মাংস নিজেদের তলোয়ারে গেঁথে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে খেতেন। আবার মুঘলরা তাঁদের কাবাবে বিভিন্ন ধরণের মশলা ও শুকনো ফল ব্যবহার করতেন।
বিখ্যাত খাদ্য সমালোচক ও শেফ ‘মারুত সিক্কা’র কোথায়, ঐতিহ্যের দিক থেকে দেখলে ভারতে আগে নিরামিষ খাবারদাবার বেশী খাওয়া হতো। যেখানে কাবাব সম্পূর্ণ ভাবে বহিরাগত। তবে রাজপুতনার একটি প্রাচীন প্রথা ছিল শিকার করা হরিণের মাংস মশলা মাখিয়ে পুড়িয়ে খাওয়া। একে বলা হতো ‘সুলা’ বা ‘মানস কা সুলা’। এটাই সম্ভবত ভারতের প্রথম কাবাব ছিল।
সময়ের সাথে সাথে যেমন জীবন যাপনে পরিবর্তন আসে। ঠিক তেমন ভাবেই পরিবর্তন আসে খাবারেও। বাইরে থেকে আসা কাবাবের মধ্যেও ঘটেছিল ভারতীয়করণ। যেমন দহি কাবাব, পনির টিক্কা, হরিয়ালি কাবাব, টুন্ড-কি-কাবাব, শুভার-কি-সাথ (শুয়োরের মাংসের তৈরি), শামি কাবাব ইত্যাদি ইত্যাদি কাবাব সম্পূর্ণ ভারতীয় কাবাবের পদ। এছাড়াও বিভিন্ন প্রকারের নিরামিষ কাবাবের প্রচলন হয় ভারত থেকেই।
কাবাব যেখান থেকেই আসুক না কেন ভারত বা কলকাতার মানুষ এর স্বাদে মাতোয়ারা। তাই সন্ধ্যে নামলেই কাবাব প্রেমিদের ঢল পড়ে যায় কলকাতার অলি গলির বিভিন্ন খাবার দোকানে। এমনই বিশেষ কয়েকটি কাবাব হল শাওায়ারমা কাবাব, রেশমি কাবাব, গলৌটি কাবাব, সুতলি কাবাব, শামি কাবাব, পাত্থর কে কাবাব (গরম পাথরের উপর সেঁকে তৈরি হয়), বাহারি কাবাব, টিক্কা কাবাব, পনীর কাবাব ইত্যাদি।

কমেন্টস
একটু ইতিহাস বিকৃত হলো। ভারতে নিরামিষ বেশি খাওয়া হতো তথ্যটি ঠিক ন য় ।প্রকৃত ভূমি পুত্ররা শুধু নয়, আর্য্যদের খাদ্যাভ্যাসে প্রচুর মাংসের কাবাব এর চল ছিল ।রামায়ণ মহাভারতে বাছুর,হরিণ, শজারু, খরগোশ, গোসাপ, বরাহ সহ প্রচুর প্রাণী খাওয়া হতো। অশ্বমেধ যজ্ঞের পর সেই ঘোড়া বলি দিয়ে সেই মাংস যজ্ঞে দেওয়া হতো পরে খাওয়া হত।